"এখন থেকে সংবাদমাধ্যমে না, কোনো বক্তব্য থাকলে ফেসবুকেই জানাব"—পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল বিপর্যয়ের পর দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে এভাবেই নিজের নতুন রাজনৈতিক কৌশলের কথা ঘোষণা করলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
গত ৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়, যেখানে ফের সরকার গঠন করে বিজেপি। এরপর থেকে জনসমক্ষে কার্যত দেখাই যায়নি সাবেক মুখ্যমন্ত্রীকে। কেবল একটি সংক্ষিপ্ত সাংবাদিক বৈঠক করেছিলেন তিনি। তবে শনিবার বিকেলে আচমকাই ফেসবুক লাইভে এসে রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেন এই তৃণমূল নেত্রী।
ইভিএম কারচুপি ও নির্বাচন কমিশনের দিকে আঙুল
দীর্ঘ ফেসবুক লাইভে কেন্দ্রীয় সরকার, বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের (ECI) বিরুদ্ধে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার দাবি, নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ২২০ থেকে ২৩০টি আসন পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পুরো পরিস্থিতি বদলে দেওয়া হয়েছে।
"জাতীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি (IT) ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। ভোটযন্ত্রের (EVM) পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আমাদের প্রয়োজন। এবারের ভোটের ফল মোটেও স্বাভাবিক ছিল না।"
— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
যদিও এই অভিযোগের সপক্ষে কোনো প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করেননি এবং নির্বাচন কমিশনও শুরু থেকেই ইভিএম কারচুপির এই দাবি অস্বীকার করে আসছে।
রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অস্বাভাবিক’ আখ্যা
মমতা দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ভয় ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে। কেউ চাকরি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন, আবার কেউ ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে দুশ্চিন্তায় ভুগছেন।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা নিয়ে ক্ষমতাসীন বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন:
দলের ২ হাজারেরও বেশি তৃণমূল কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বহু হকার ও ছোট ব্যবসায়ীর জীবিকা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়েছে।
আজান বিতর্ক ও যুবভারতীর ভাস্কর্য ভাঙা নিয়ে ক্ষোভ
ফেসবুক লাইভে ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রসঙ্গ টেনে মমতা বলেন, আজান নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা অনুচিত। শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, কিন্তু কারও ধর্মীয় অধিকার কেড়ে নেওয়া ঠিক নয়। সবার জন্য একই নিয়ম থাকা উচিত।
পাশাপাশি, যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের একটি বিখ্যাত ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থাও (FIFA) যেটির প্রশংসা করেছিল এবং যেখানে শিশুরা ছবি তুলত, সেই স্মৃতিচিহ্নটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে নষ্ট করা হয়েছে।
কেন সংবাদমাধ্যম বয়কটের ডাক?
প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের (Mainstream Media) প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে মমতা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এখন থেকে তিনি আর গণমাধ্যমে সরাসরি কথা বলবেন না। নিজের যেকোনো রাজনৈতিক অবস্থান বা বক্তব্য তিনি ফেসবুক লাইভের মাধ্যমেই জনগণের দরবারে পৌঁছে দেবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূল কংগ্রেস এখন সম্পূর্ণ নতুন ধারার রাজনৈতিক লড়াইয়ের পথে হাঁটছে। মাঠের আন্দোলনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে (Social Media) দলীয় প্রতিরোধের প্রধান অস্ত্র করতে চাইছেন মমতা।
বিশেষ করে তরুণ ভোটার এবং শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে সরাসরি পৌঁছাতে তার এই ডিজিটাল কৌশল আগামী দিনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।