বিজেপির বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ মমতার

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও রাজনৈতিক উত্তাপ এখনো কমেনি। বরং পরাজয়ের পর এবার আদালতের পথে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। 

দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্পষ্ট অভিযোগ, নির্বাচনে মানুষ তৃণমূলকেই ভোট দিলেও পরিকল্পিতভাবে তাদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের যৌথ কৌশলেই তাকে রাজনৈতিক ময়দান থেকে সরানোর চেষ্টা হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন তিনি।

রোববার ফলতা উপনির্বাচনের ফল ঘোষণার দিন ফের বিস্ফোরক মন্তব্য করেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী। নিজের পুরনো কেন্দ্র ভবানীপুরের ফল নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, কীভাবে জয় হয়েছে, তা আদালতেই প্রমাণ হবে। ইভিএমের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং রিপোর্ট প্রকাশের দাবিও তুলেছেন তিনি। তার অভিযোগ, গণনার সময় বহু জায়গায় অনিয়ম হয়েছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তৃণমূলকে হারানো হয়েছে। 

তৃণমূল সূত্রে জানা গেছে, অন্তত ৫০টির বেশি আসনে নির্বাচনি আবেদন দায়েরের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ভোট গণনা, ইভিএমের তথ্য, সিল করা নথির নম্বরসহ বিভিন্ন অসঙ্গতির অভিযোগ আদালতে তুলে ধরতে চাইছে দল। এই পুরো প্রক্রিয়ার দায়িত্বে রয়েছেন তৃণমূলের আইনজীবী সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। জেলা থেকে আসা বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে মামলার খসড়া তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। তবে আদালতের লড়াইয়ে নামতে গিয়ে অস্বস্তিতেও পড়েছে তৃণমূল। কারণ দলের অনেক পরাজিত প্রার্থীই আইনি লড়াইয়ে যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। 

দলীয় সূত্রের খবর, বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে প্রার্থীদের রাজি করানো যাচ্ছে না। ফলে মামলার কৌশল তৈরিতে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

এই প্রসঙ্গে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতা ও সংগঠনের সুবিধা ভোগ করার পর এখন অনেকেই সরে যাচ্ছেন। বিশেষ করে জাঙ্গিপাড়ার পরাজিত প্রার্থী স্নেহাশিস চক্রবর্তীর নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাকে নির্বাচনি আবেদন করার কথা বলা হলেও তিনি রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে তৃণমূলের তরুণ নেতৃত্বের একাংশ আবার এই আইনি লড়াইকে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের লড়াই হিসেবেই দেখছে। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে ও পরাজিত প্রার্থী শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়মিতভাবে দলের আইনি প্রস্তুতিতে যুক্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে বৈঠক, জেলা রিপোর্ট সংগ্রহ এবং মামলার নথি তৈরির কাজেও তিনি অংশ নিচ্ছেন। তৃণমূলের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ইভিএম ও ভোট গণনা। 

দলের দাবি, বহু কেন্দ্রে সিল করা নথির নম্বরের সঙ্গে গণনার তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি। ভোটযন্ত্রের চার্জ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, মানুষের রায়কে অন্যভাবে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে হারলেও তৃণমূল এখনই রাজনৈতিকভাবে পিছু হটতে চাইছে না। বরং আদালত ও জনমতকে সামনে রেখে নিজেদের নতুন লড়াই শুরু করতে চাইছে। বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে আগামী দিনের আন্দোলনের ভিত তৈরি করার কৌশল নিচ্ছে দল। তবে পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, শুধু অভিযোগ তুলে নয়, আদালতে শক্ত প্রমাণ হাজির করাই হবে তৃণমূলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ নির্বাচনি আবেদন দীর্ঘ ও জটিল আইনি প্রক্রিয়া। সেখানে দলের পরাজিত প্রার্থীদের অনীহাও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। 

তবুও মমতার সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি এই পরাজয়কে শেষ বলে মানতে নারাজ। আদালত, আন্দোলন ও রাজনৈতিক বার্তার মধ্য দিয়েই ফের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই শুরু করতে চাইছে তৃণমূল কংগ্রেস।