হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে যা বললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় 

বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে এবার বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন পশ্চিমবঙ্গের সদ্য সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার এই চাঞ্চল্যকর দাবির পর ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

মঙ্গলবার (২ জুন) কলকাতার ঝর্ণা মঞ্চে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে আয়োজিত এক অবস্থান কর্মসূচি থেকে তিনি এই দাবি করেন।

মেঘালয় হয়ে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়েছিল হাদির খুনিরা!

 

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হাদি হত্যাকাণ্ডের পর জড়িত কয়েকজন অপরাধী মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছিল। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্স (STF) তৎপরতার সাথে তাদের গ্রেফতারও করে।

তিনি বলেন:

"দেশের স্বার্থে, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থে এবং দুই প্রতিবেশী দেশের সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আমি এতদিন এই বিষয়ে মুখ খুলিনি। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক অপ্রকাশিত সত্য এখন সামনে আনা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।"

নীরব থাকার পেছনে কেন্দ্রের ‘নিষেধাজ্ঞা’?

সদ্য সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, গ্রেফতারের পর বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য না করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কেন্দ্রের এই গোপনীয়তা বজায় রাখার বার্তার কারণেই তিনি এতদিন নীরব ছিলেন বলে জানান।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তিনি যদি এই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য ও নেপথ্যের কাহিনী প্রকাশ করতে শুরু করেন, তবে বাংলাদেশেও এর বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। আর সেই কারণেই তিনি এখনও যথেষ্ট সংযত অবস্থান বজায় রাখছেন।

কেন এই সময়ে মুখ খুললেন মমতা?

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক এবং দুই দেশের গোয়েন্দা তৎপরতার মতো সংবেদনশীল বিষয় সাধারণত প্রকাশ্য রাজনৈতিক মঞ্চে আলোচনা করা হয় না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যকার চলমান তীব্র সংঘাতের জের ধরেই মমতা এই কৌশলগত চাল চাললেন।

সম্প্রতি সোনারপুরে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। তৃণমূলের দাবি, কেন্দ্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে বিরোধী দল ও নেতাকর্মীদের নিশানা করা হচ্ছে।

মমতার এই বক্তব্যের মূল কারণগুলোকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ৩টি ভাগে দেখছেন:

রাজনৈতিক পাল্টা আক্রমণ: কেন্দ্রীয় সরকারের এজেন্সির রাজনীতির বিরুদ্ধে এটি মমতার একটি বড় কাউন্টার-অ্যাটাক।

আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি: বাংলাদেশ প্রসঙ্গ টেনে কেন্দ্রীয় সরকারকে কূটনৈতিক ও কৌশলগত চাপে ফেলা।

গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন: কিছুদিন আগেই মমতা ঘোষণা করেছিলেন যে সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষায় তিনি রাজপথে নামবেন। মঙ্গলবারের অবস্থান কর্মসূচি ছিল তারই অংশ।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাবের শঙ্কা

রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, মমতার এই বিস্ফোরক বক্তব্য কেবল পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এবং সীমান্ত গলদ নিয়ে তাঁর এই দাবি ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও বড় ধরনের ঝড় তুলতে পারে।

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিজেপির কেন্দ্রীয় বা রাজ্য নেতৃত্বের পক্ষ থেকে মমতার এই নির্দিষ্ট অভিযোগের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে কলকাতার রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন একটাই প্রশ্ন—দীর্ঘদিন চেপে রাখার পর ঠিক কোন সমীকরণ মেলাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাদি হত্যাকাণ্ডকে সামনে নিয়ে এলেন? আগামী দিনে তিনি এ বিষয়ে আরও কোনো গোপন নথি বা তথ্য ফাঁস করবেন কি না, তা নিয়ে চলছে জোর গুঞ্জন।