ইবোলা ভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণের আশঙ্কায় উগান্ডা ও কঙ্গো সীমান্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়ায় চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন দুই দেশের শত শত ব্যবসায়ী। সীমান্ত পারাপারের অপেক্ষায় থাকা পণ্যবাহী ট্রাকের মাইলের পর মাইল দীর্ঘ সারিতে পচে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার কাঁচামাল ও খাদ্যসামগ্রী। জীবিকা হারানোর তীব্র হতাশায় দিন কাটছে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সংক্রমণ ঠেকাতে উগান্ডা কর্তৃপক্ষের এমন কঠোর সিদ্ধান্তে সীমান্তজুড়ে এখন কেবলই হাহাকার।
উগান্ডা-কঙ্গো সীমান্তের অন্যতম ব্যস্ত মপোন্ডওয়ে সীমান্ত চৌকিতে এখন শুধুই স্থবিরতা। কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশে প্রাণঘাতী ইবোলার প্রাদুর্ভাবের পর গত ২৮শে মে থেকে কার্যকর হওয়া এই সীমান্ত বন্ধের সিদ্ধান্তে থমকে গেছে দুই দেশের অর্থনৈতিক চাকা। সীমান্তের উভয় পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে শত শত ট্রাক। উগান্ডাগামী একটি ট্রাকের পাশে দাঁড়িয়ে প্রায় কেঁদে ফেলেছিলেন কলা ব্যবসায়ী লিয়া মাসিকা। তার মূল্যবান কলার চালানের বস্তাগুলো থেকে ইতোমধ্যে জল চুইয়ে পড়তে শুরু করেছে। তিনি জানান, দ্রুত কোনো ব্যবস্থা না নিলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার পুরো চালানটি পচে ডাস্টবিনে চলে যাবে। মপোন্ডওয়ে সীমান্ত চৌকি দিয়ে ট্রাক চলাচলের জন্য কর্তৃপক্ষের একটুখানি ছাড়পত্রের আশায় প্রহর গুনছেন এই উগান্ডান ব্যবসায়ী। ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমাদের চোখের সামনে জিনিসপত্র এখানে পচে যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের কিছুই করার নেই।'
কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে ইবোলার প্রাদুর্ভাব ঘোষণার প্রায় দুই সপ্তাহ পর উগান্ডা সরকার তার পশ্চিম সীমান্ত পুরোপুরি সিল করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মূলত আন্তঃসীমান্ত সংক্রমণের ক্রমবর্ধমান ভয় থেকেই এই কঠোর পদক্ষেপ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, শুধুমাত্র জরুরি মানবিক পরিস্থিতি, চিকিৎসাসামগ্রী ও নিরাপত্তাজনিত সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া কোনো সাধারণ যানবাহন বা মানুষ সীমান্ত পার হতে পারবে না। কিন্তু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পূর্ব কঙ্গোতে ইবোলার বিস্তার কমার পরিবর্তে আরও বৃদ্ধি পাওয়ায়, উগান্ডার সীমান্ত জেলা কাসেসের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নজরদারি ও কড়াকড়ি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে বৈধ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্যবাহী ট্রাক আটকে রাখার এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতির এবং অবাস্তব। ম্পোন্ডওয়ে সীমান্ত চৌকিতে অপেক্ষারত ব্যবসায়ীদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ইবোলা সংক্রমণের ভয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি তা তারা বোঝেন, কিন্তু এভাবে দিনের পর দিন ট্রাকগুলোকে আটকে রাখাটা স্পষ্টতই বাড়াবাড়ি। সিলভিয়া আসিমওয়ে নামে একজন ক্লিয়ারিং এজেন্ট উগান্ডার দিকে এক মাইলেরও বেশি দীর্ঘ ট্রাকের সারি দেখিয়ে বলেন, এর মধ্যে অন্তত সাতটি ট্রাকে চীন থেকে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ মাছ রয়েছে। এই মাছগুলো কঙ্গোর বেনি ও বুটেম্বো শহরের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। আসিমওয়ে ক্ষোভের সাথে যোগ করেন, কঙ্গোর ওই শহরগুলো উত্তর কিভু প্রদেশে অবস্থিত, যা ইবোলার কেন্দ্রস্থল ইতুরি থেকে বেশ দূরে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, 'এখানে রাজনীতির মারপ্যাঁচে কোটি কোটি টাকার মাছ পচে নষ্ট হয়ে যাবে। ব্যবসায়ীদের এই বিশাল ক্ষতি কে পূরণ করবে?'
উগান্ডা ও কঙ্গোর এই সীমান্তটি কয়েকশ মাইল দীর্ঘ। আনুষ্ঠানিক সীমান্ত চৌকি ছাড়াও অসংখ্য পাহাড়ি ও পায়ে চলা পথ দিয়ে এই দুই দেশের মানুষ যাতায়াত করে। ম্পোন্ডওয়ে রুটে উগান্ডার বাকোঞ্জো জনগোষ্ঠী এবং কঙ্গোর অপর পাশের বানান্দে জনগোষ্ঠীর মধ্যে শুধু ব্যবসাই নয়, রয়েছে গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক। উগান্ডা পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে অনানুষ্ঠানিক রপ্তানির জন্য ম্পোন্ডওয়ে ছিল উগান্ডার শীর্ষ সীমান্ত চৌকি, যার আনুমানিক বার্ষিক বাণিজ্য মূল্য ছিল প্রায় ১৩১ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু বর্তমান অচলাবস্থার কারণে সীমান্তের প্রাণচঞ্চল বাজারগুলো এখন জনমানবহীন। অনেক দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল শত শত কুলি ও দিনমজুর যুবক কাজ হারিয়ে অলস সময় পার করছে। রাস্তার ধারে খাবার বিক্রি করা ইসমাইল মুমবেরে বলেন, 'এখানকার পরিস্থিতি দিন দিন নরক হয়ে উঠছে। এই সীমান্তের ব্যবসার ওপর হাজার হাজার মানুষের রুটিরুজি নির্ভর করে। এখন সরকার বলছে ইবোলা এসেছে। এই মহামারি আমাদের পেট চালানো, বেঁচে থাকার সব পথ বন্ধ করে দিল।'
বর্তমানে কঙ্গোতে চলমান এই প্রাদুর্ভাবে ১,০০০ জনেরও বেশি মানুষ সংক্রমিত হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা এর চেয়ে কম, কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক রোগী হাসপাতালের আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার বাইরেই মারা যাচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই প্রাদুর্ভাবকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের একটি জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করলেও, সদস্য দেশগুলোকে সীমান্ত বন্ধ না করার জন্য নিরূৎসাহিত করেছে। কারণ এতে অর্থনৈতিক বিপর্যয় আরও বাড়ে। তবে জাতিসংঘের এই সংস্থাটি এও স্বীকার করেছে যে প্রতিবেশী দেশগুলো সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
কাসেসের সীমান্ত নজরদারি কর্মকর্তা আরাফাত বাম্বালে সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, পণ্য এবং ট্রাক চলাচলের সাথে মানুষের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকে। মানুষ চলাচল করলে ভাইরাস ছড়াবেই, তাই আমরা কঠোর হতে বাধ্য হচ্ছি। তিনি জানান, আনুষ্ঠানিক সীমান্তের বাইরে প্রায় দুই ডজনেরও বেশি গোপন পায়ে চলা পথ দিয়ে কঙ্গোর নাগরিকদের উগান্ডায় অনুপ্রবেশ ঠেকাতে যৌথ বাহিনী কাজ করছে। এবারের প্রাদুর্ভাবটি আরও বেশি উদ্বেগজনক কারণ কঙ্গোতে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি অত্যন্ত বিরল ‘বুন্দিবুগিও’ ধরনের ইবোলা। এই নির্দিষ্ট জাতের ইবোলা রোগীদের ক্ষেত্রে বর্তমানে উপলব্ধ কোনো টিকা বা প্রচলিত চিকিৎসা কাজ করে না।
ইতিমধ্যেই উগান্ডায় ১৫টি ইবোলা সংক্রমণের ঘটনা নিশ্চিত হওয়া গেছে, যার সবগুলোই কঙ্গোর প্রাদুর্ভাবের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। কঙ্গোর কিছু নাগরিক ইবোলার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগেই চিকিৎসার উদ্দেশ্যে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় চলে আসায় এই সংক্রমণ ছড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, গত ১৫ই মে অফিশিয়ালি প্রাদুর্ভাব ঘোষণার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই রোগটি নীরবে ছড়াচ্ছিল। ২০০০ সালেও উগান্ডায় ইবোলার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল, যা কেড়ে নিয়েছিল ২০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণ।
১৯৭৬ সালে কঙ্গো নদীর একটি উপনদীর অববাহিকায় প্রথম এই ভাইরাসের সন্ধান মেলে। বন্য ফলভোজী বাদুড় বা সংক্রামিত পশুর মাংস স্পর্শ ও খাওয়ার মাধ্যমে এটি মানুষের দেহে প্রবেশ করে। একবার মানুষের শরীরে ছড়ানোর পর আক্রান্ত ব্যক্তির ঘাম, রক্ত, মল বা বমির মতো শারীরিক তরলের সংস্পর্শে এলে অন্যরাও দ্রুত আক্রান্ত হয়। কাসেসের স্থানীয় চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আইসোলেশন সেন্টারে দ্রুত পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও তারা নতুন করে আর কোনো ঝুঁকি নিতে চান না। ইবোলা টাস্ক ফোর্সের আগামী বৈঠকে সীমান্ত পারাপারে আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এদিকে প্রশাসনের এমন অনমনীয় অবস্থানে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন লিয়া মাসিকার মতো ক্ষুদ্র ও মাঝারি কাঁচামাল বিক্রেতারা। মাসিকা জানান, কঙ্গো থেকে আনা কলার প্রতিটি বস্তার মূল্য প্রায় ৪৪ ডলার। ৫০ বস্তা কলার এই চালানটি পুরোপুরি নষ্ট হলে তিনি দেউলিয়া হয়ে যাবেন। কারণ এই কাঁচা কলাগুলো রাজধানী কাম্পালার বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় সকালের নাস্তায় ভাজা বা সেদ্ধ করে পরিবেশনের জন্য চড়া দামে বিক্রি হওয়ার কথা ছিল। অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি বলেন, 'আমরা সরকারের কাছে সীমান্ত খুলে দেওয়ার আকুতি জানাচ্ছি। পণ্যগুলো খালাস করতে দিলে আমরা আর কঙ্গোতে ফিরে যাব না, শুধু এবারের মতো আমাদের বাঁচানো হোক।' সূত্র: আরব নিউজ