ভেনেজুয়েলায় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ও শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা এই তীব্র ভূকম্পনে রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য বহুতল ভবন ধসে পড়েছে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, এই বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ।
ইউএসজিএস (USGS) এর তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় বুধবার বিকেল ৬টা ৪ মিনিটে প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে, যার মাত্রা ছিল ৭.২। এর ঠিক ৩৯ সেকেন্ড পর আরও একটি শক্তিশালী ৭.৫ মাত্রার প্রধান ভূকম্পন অনুভূত হয়।
ভূমিকম্প দুটির উৎপত্তিস্থল ছিল দেশটির ক্যারিবীয় উপকূলের মরন অঞ্চলের কাছে, যা রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। প্রথমটির গভীরতা ছিল ২২ কিলোমিটার এবং পরেরটির গভীরতা ছিল ১৩ কিলোমিটার। ভূমিকম্পের সময় দেশে জাতীয় ছুটি চলায় অধিকাংশ মানুষই নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।
ভূমিকম্পের পর পুরো ভেনেজুয়েলায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানীর আপমার্কেট এলাকা ‘আলতামিরা’—যেখানে অনেক বিদেশী দূতাবাস অবস্থিত—সেখানে অন্তত তিনটি বহুতল ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়ার খবর নিশ্চিত করেছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। এছাড়া সান বার্নার্ডিনো এলাকায় ভবন ধসে বহু মানুষ ভেতরে আটকা পড়েছেন। ধূলিকণায় অন্ধকার হয়ে যাওয়া কারাকাসের রাস্তায় সাধারণ মানুষকে তাদের গৃহপালিত প্রাণী ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে দেখা যায়। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে জীবিত ও মৃতদের উদ্ধারে উদ্ধারকর্মী এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন।
তীব্র ঝাঁকুনিতে কারাকাসের অন্যতম প্রধান মাইকেতিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ওপর থেকে ভেঙে পড়া ধ্বংসস্তূপের হাত থেকে বাঁচতে যাত্রীরা দিকবিদিক ছুটছেন। অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ টেলিভিশন ভাষণে বিমানবন্দরটি বন্ধ করার ঘোষণা দেন। একই সাথে রাজধানী কারাকাসের মেট্রো এবং ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
কারাকাসের ঠিক উত্তরে অবস্থিত বন্দর নগরী 'লা গুয়াইরা' সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানকার বিখ্যাত সৈকতসংলগ্ন হোটেল 'এদুয়ার্দস হোটেল বুটিক' প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। কাতিয়া লা মার অঞ্চলের নৌবাহিনী একাডেমি এবং বেশ কিছু বহুতল আবাসিক ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বারুতা উপশহরে ভূমিকম্পের প্রভাবে বড় ধরনের ভূমিধস ঘটেছে, যেখানকার ধসে পড়া ভবন থেকে সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা স্ট্রেচারে করে ভুক্তভোগীদের উদ্ধার করছেন।
টেলিভিশন ভাষণে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশবাসীকে শান্ত ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো দ্রুত খালি করার নির্দেশ দিয়েছেন। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ভিটিভিকে বলেন, "পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। বেশ কিছু এলাকা দৃশ্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।" ভূমিকম্পের পর শক্তিশালী আফটারশক বা অনুকম্পনের কারণে দুর্বল হয়ে পড়া আরও ভবন ধসে পড়তে পারে সতর্ক করে তিনি সবাইকে খোলা জায়গায় থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
এদিকে, নির্বাসিত বিরোধী দলীয় নেতা ও নোবেল বিজয়ী মারিয়া করিনা মাচাদো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক বার্তায় লিখেছেন, "শঙ্কার এই মুহূর্তে প্রতিটি ভেনেজুয়েলান পরিবারের জন্য আমার প্রার্থনা রইল। এই কঠিন সময়ে আমাদের মধ্যে শক্তি, প্রশান্তি এবং সংহতি বজায় থাকুক।"
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস তাদের নাগরিকদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ও ভবন এড়িয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। সূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি