৩ দেশে শক্তিশালী ভূমিকম্পের তাণ্ডব, বড় কোনো বিপর্যয়ের ইঙ্গিত?

বিশ্বের তিনটি ভিন্ন দেশে আঘাত হেনেছে শক্তিশালী পৃথক তিনটি ভূমিকম্প। বুধবার ও বৃহস্পতিবারের (২৪-২৫ জুন) মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র (ক্যালিফোর্নিয়া), ভেনেজুয়েলা এবং জাপানে এই ভূকম্পনগুলো অনুভূত হয়।

তিনটি ভূমিকম্পের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রলয়ঙ্কারী কম্পনটি রেকর্ড করা হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায়। দেশটির ক্যারিবীয় উপকূলের মরন অঞ্চলে স্থানীয় সময় বুধবার বিকেল ৬টার কিছু পর প্রথমে ৭.২ মাত্রার একটি কম্পন আঘাত হানে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানায়, এর ঠিক ৩৯ সেকেন্ড পর সেখানে আরও একটি ৭.৫ মাত্রার তীব্র মূল ভূকম্পন আঘাত হানে। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাজধানী কারাকাসের একাধিক বহুতল ভবন ধসে পড়েছে।

ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো পরিস্থিতিকে "উদ্বেগজনক" আখ্যা দিয়ে আফটারশকের আশঙ্কায় নাগরিকদের ঘরের বাইরে অবস্থানের পরামর্শ দিয়েছেন। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে মাত্র ২৮ কিলোমিটার দূরে মনতালবানে দেশের অন্যতম বৃহৎ তেল শোধনাগারগুলো অবস্থিত হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এদিকে, ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে ৩০০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকার মধ্যে বিপজ্জনক সুনামি তরঙ্গ আছড়ে পড়ার সতর্কতা জারি করেছে মার্কিন সুনামি সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এই ঝুঁকির আওতায় রয়েছে পুয়ের্তো রিকো এবং ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জও।

এদিকে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে জাপান। দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় ইওয়াতে উপকূলে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৬.৯ এবং এর গভীরতা ছিল ৫১ কিলোমিটার।

ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে সাত ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত রাজধানী টোকিওতেও তীব্র কম্পন অনুভূত হয়, যা সকালের ব্যস্ত সময়ে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করে তোলে। সতর্কতাস্বরূপ জাপানের দীর্ঘতম বুলেট ট্রেন লাইন ‘তোহোকু শিনকানসেন’ এর চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে জাপানের পক্ষ থেকে সুনামির সতর্কতা বাতিল করা হয়েছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা বড় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, জাপান প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত হওয়ায় এটি বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ।

এই জোড়া দুর্যোগের ঠিক আগে, স্থানীয় সময় বুধবার সকাল ৮টার পর যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার গ্রামীণ উপকূলীয় এলাকায় ৫.৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। ওই কৃষিপ্রধান অঞ্চলে ১৯৪০ সালের পর এটিই রেকর্ডকৃত সবচেয়ে শক্তিশালী ভূকম্পন। মূল কম্পনের এক ঘণ্টার মধ্যে সেখানে ২.৭ মাত্রার চেয়ে কম শক্তিশালী আরও তিনটি আফটারশক অনুভূত হয়।

ভূমিকম্পের তীব্রতায় রেডউড ভ্যালি মার্কেটের সুপারশপের মালামাল তাক থেকে ছিটকে মেঝেতে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। নিকটবর্তী ক্লাব ক্যালপেলা রেস্তোরাঁর এক কর্মী জানান, ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিটি এত তীব্র ছিল যে মনে হচ্ছিল কোনো বিশাল বস্তু সরাসরি এসে তাদের ভবনে আঘাত করেছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ সংস্থা ক্যালটেকের ভূকম্পবিদ ড. লুসি জোন্সের বরাতে জানিয়েছে, এ ধরনের ঘটনার মধ্যে কোনো ধরনের যোগসূত্র নেই। ভূমিকম্পগুলো পৃথক ফল্ট সিস্টেম এবং প্লেট সীমানায় সংঘটিত হয়েছে। এর অর্থ হলো একটির কারণে অন্যটি ঘটেনি। হাজার হাজার মাইল দূরে সংঘটিত বড় ভূমিকম্পগুলো সাধারণত অন্য কোথাও আরেকটি বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বাড়ায় না।

জোন্স আরও বলেন, সময়কালটি কাকতালীয় মিলে গেছে। কিন্তু স্থানগুলো ভিন্ন ভিন্ন রয়েছে। প্রতিটি ভূমিকম্প সক্রিয় প্লেট সীমানা বরাবর আঘাত হেনেছে। এসব এলাকায় কয়েক দশক এমনকি শতাব্দী ধরে চাপ তৈরি হচ্ছিল। অঞ্চলগুলোতে বড় ভূমিকম্প প্রাকৃতিক চক্রের একটি প্রত্যাশিত ঘটনা। যদিও ভূমিকম্প ঠিক কখন একটি ঘটবে তা সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করা অসম্ভব। সূত্র: সিএনএন, এনবিসি এবং এপি।