ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৮৯ জনে দাঁড়িয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো প্রায় এগারো হাজার মানুষ আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, কানাডা, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, এল সালভাদর, কিউবাসহ আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশ এবং জাতিসংঘ উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসক ও মানবিক সহায়তা পাঠানো শুরু করেছে।
বুধবার (২৪ জুন) আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প ছিল গত এক শতাব্দীর মধ্যে ভেনেজুয়ায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি। এতে প্রায় তিন হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্লোস আলভারাদো জানিয়েছেন, হাসপাতালে আহতদের উপচে পড়া ভিড় এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা চরম চাপে রয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো আরও বহু মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে যাদের স্বজন আটকে আছেন, তাদের জানাতে চাই, সহায়তা পৌঁছে দিতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে রাজধানী কারাকাসের উত্তরের উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো জানিয়েছেন, সেখানে শতাধিক ভবন ধসে পড়েছে এবং অন্তত ৭০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভেনেজুয়েলার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও, ফলে সেটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
লা গুয়াইরা শহরে স্বেচ্ছাসেবকেরা খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খুঁজছেন। অন্যদিকে কারাকাস-লা গুয়াইরা মহাসড়ক দিয়ে অসংখ্য মানুষ পানি, খাদ্য ও ওষুধ নিয়ে দুর্গত এলাকায় ছুটে যাচ্ছেন।
ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি ও ব্যবসা হারানো ৬৪ বছর বয়সী পেদ্রো পেরেজ বলেন, আমরা সবকিছু হারিয়েছি। খাবার নেই, ওষুধ নেই। দ্রুত সহায়তা পৌঁছানোর অপেক্ষায় আছি।
রাজধানী কারাকাসেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। আফটারশকের আশঙ্কায় বহু মানুষ বাড়িতে না ফিরে সড়কে কিংবা গাড়ির ভেতর রাত কাটিয়েছেন।
আল জাজিরার কারাকাস প্রতিনিধি মারিয়া এমিলিয়া মিরো কেসাদা বলেন, মানুষ এখনো ভবনে ফিরতে ভয় পাচ্ছে। ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে তাদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা কাজ করছে।
প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়া থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি আলেসান্দ্রো রাম্পিয়েত্তি বলেন, ভূমিকম্পের আগেই ভেনেজুয়েলার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অবকাঠামো গভীর সংকটে ছিল। বিদ্যুৎ বিভ্রাট, জনবল সংকট এবং সীমিত চিকিৎসা সুবিধার কারণে উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ১৫ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তা, যুদ্ধজাহাজ, পরিবহন বিমান ও হেলিকপ্টার পাঠানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, দ্রুত ও কার্যকরভাবে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।
ব্রাজিল একটি ভ্রাম্যমাণ ফিল্ড হাসপাতাল, দমকলকর্মী ও উদ্ধারকর্মী পাঠাচ্ছে। এল সালভাদর ৩০০ উদ্ধারকর্মী, চিকিৎসাকর্মী এবং ৫০ টন সরঞ্জাম ও ত্রাণ প্রস্তুত রেখেছে। কিউবা চিকিৎসক দল মোতায়েন করেছে, মেক্সিকো সামরিক উদ্ধারকারী ও চিকিৎসা দল পাঠিয়েছে এবং কলম্বিয়া ৬০ জনের বেশি উদ্ধারকর্মী ও ১২ টন মানবিক সহায়তা পাঠাচ্ছে।
এ ছাড়া চীন, ভারত, তুরস্ক, জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, চেক প্রজাতন্ত্র, ইরান এবং ভ্যাটিকানও বিভিন্ন ধরনের সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশন পুনর্বাসন কার্যক্রমে ২৫ লাখ ডলার বরাদ্দ করেছে। ভ্যাটিকান জরুরি সহায়তা হিসেবে এক লাখ ইউরো দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, জাতিসংঘের প্রত্যয়নপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো এখন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক এই সহযোগিতা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের জীবিত উদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। সূত্র: আলজাজিরা