ইউক্রেনে রাশিয়ার নজিরবিহীন হামলা, নিহত ২৭

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাতভর ব্যাপক ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। এতে অন্তত ২৭ জন নিহত এবং ৯১ জন আহত হয়েছেন। কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিচকো এই হামলাকে রাজধানীর ওপর চালানো রাশিয়ার "সবচেয়ে গণ-আক্রমণ" বলে বর্ণনা করেছেন। আহতদের মধ্যে একটি অ্যাম্বুলেন্স স্টেশনের কর্মীরাও রয়েছেন।

ইউক্রেনের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তৈমুর তকাচেনকো হতাহতের এই সংখ্যা নিশ্চিত করেছেন। বিগত কিছু হামলায় এর চেয়ে বেশি মানুষ মারা গেলেও, এবারের হামলায় সবচেয়ে বেশি অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং শহরের বিশাল এলাকা জুড়ে আঘাত হানা হয়েছে। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার এই আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। এর পরপরই শহরের বেশ কয়েকটি এলাকা খালি করা হয়।

স্থানীয় সময় বুধবার (১ জুলাই) কিয়েভের ওপর এই হামলা টানা ১১ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বেশ কয়েকটি ধাপে চালানো হয়। প্রথমে শহরের ঐতিহাসিক কোয়ার্টারে ড্রোন হামলার মাধ্যমে শুরু হয়, যা শহরের কেন্দ্রের একটি হোটেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর রাত ১টায় শুরু হয় ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইলের বৃষ্টি। মাঝে কিছুটা বিরতি দিয়ে ভোর পর্যন্ত দফায় দফায় ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইল দিয়ে পুরো শহরকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া রাতভর ৭৪টি মিসাইল এবং ৪৯৬টি ড্রোন ছুড়েছে, যার মূল লক্ষ্য ছিল রাজধানী। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশিরভাগ হামলা প্রতিহত করতে পারলেও ২৫টি ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ১২টি ড্রোন শহরের ৩৩টি স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম হয়।

আঘাতপ্রাপ্ত স্থানগুলোর মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব কিয়েভের দার্নিটস্কি জেলার একটি ৯ তলা আবাসিক ভবন রয়েছে। মিসাইলের আঘাতে ভবনটির একটি অংশ ধসে পড়েছে এবং পাশে থাকা একটি কিন্ডারগার্টেনের কাছে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া ইউক্রেনীয় রেড ক্রসের একটি গুদামঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে প্রায় ১৩ লাখ পাউন্ড মূল্যের ত্রাণ সামগ্রী নষ্ট হয়েছে।

কিয়েভ মেট্রো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাতভর সাড়ে ৪ হাজার শিশুসহ প্রায় ৫২ হাজার ৫০০ মানুষ ভূগর্ভস্থ স্টেশনগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সর্বোচ্চ।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই হামলার দায় স্বীকার করে দাবি করেছে, ইউক্রেন কর্তৃক রাশিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বেসামরিক অবকাঠামোতে দূরপাল্লার হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে তারা কিয়েভের সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে।

ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, "লক্ষ্য অর্জনের জন্য কিয়েভ সরকারের ওপর চাপ বৃদ্ধি অব্যাহত রাখা হবে।" রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও সম্প্রতি স্বীকার করেছেন যে ইউক্রেনীয় হামলার কারণে তাদের দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে।

তবে রাশিয়ার এই দাবিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইউক্রেন। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিলহা বলেন, "এই যুদ্ধে একজন আক্রমণকারী (রাশিয়া) এবং একটি দেশ নিজেকে রক্ষা করছে (ইউক্রেন)। রাশিয়ার এই হামলাকে ইউক্রেনের আত্মরক্ষামূলক হামলার পাল্টা জবাব বলে বৈধতা দেওয়া সম্পূর্ণ অনৈতিক।"

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এই হামলার পর জরুরি ভিত্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্যাট্রিয়ট ডিফেন্স মিসাইল তৈরির লাইসেন্স এবং মিত্রদের কাছে আরও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু করার পর বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অঞ্চল রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সূত্র: আল জাজিরা