২৬ দিন পর অনশন ভাঙলেন সোনম ওয়াংচুক

দীর্ঘ ২৬ দিনের অনশন ভাঙলেন ভারতের শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ-কর্মী সোনম ওয়াংচুক। সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা 'নিট' এর প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টি এক মাসেরও বেশি সময় ধরে যে আন্দোলন চালাচ্ছে, তাতে অংশ নিয়েই ওয়াংচুক অনশন করছিলেন।

শুক্রবার দিবাগত রাতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে হাসপাতালের শয্যায় শুয়েই তিনি অনশন ভঙ্গ করেন।

সংবাদ সংস্থাগুলি যে ভিডিও আপলোড করেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে যে হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে থাকা ওয়াংচুকের পাশে দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী যেমন হাজির ছিলেন, তেমনই তার স্ত্রী এবং লেহ-লাদাখের 'এপেক্স বডি'র সিনিয়র নেতারাও ছিলেন।

সামাজিক মাধ্যমে সোনম ওয়াংচুক লেখেন, এর আগে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৬৫ জন সংসদ সদস্য আমাকে অনশন ভঙ্গ করতে অনুরোধ করেছিলেন।

ওয়াংচুক এও লিখেছেন যে, বেশ কয়েকটি শর্ত নিয়ে দীর্ঘ আলাপ আলোচনা এবং দেশজুড়ে সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কার কারণেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তিনি সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে লিখেছেন, আমি খুব শীঘ্রই একটি আলাদা ভিডিওতে এই শর্তগুলি নিয়ে বিস্তারিত ভাবে বলবো। এখন আমি আপনাদের সবাইকে একটাই অনুরোধ করব যে আপনারা কোনও রকমের সহিংসতা হতে দেবেন না, আর এই ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক থাকুন।

ওয়াংচুকের অনশন ভাঙার পরে অভিজিৎ দীপকে যা বললেন

মাঝরাতে ২৬ দিনের অনশন ভাঙার পরে ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এক ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন সামাজিক মাধ্যমে।

সেই বার্তায় দীপকে বলেন, আমরা খুশি যে সোনম স্যার ২৬ দিন পরে তার অনশন শেষ করেছেন। আপনার অসাধারণ সাহস এবং ত্যাগের জন্য ধন্যবাদ স্যার। নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গোটা দেশের চেতনাকে নাড়িয়ে দিয়েছেন। আপনার জীবন এই দেশের কাছে খুবই মূল্যবান।

দীপকে জানিয়েছেন, সোনম ওয়াংচুক অনশন শেষ করলেও কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা দিল্লির যন্তর মন্তরে যে বিক্ষোভ চালাচ্ছিলেন, তা চলবে।

ধর্ণা মঞ্চ থেকে হাসপাতালে

সোনম ওয়াংচুক ২৮ জুন থেকে অনশন শুরু করেছিলেন দিল্লির যন্তর মন্তরে।

সেখানে তারও আগে থেকে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চালাচ্ছিলেন সদ্য গড়ে ওঠা দল ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সহ অন্য সদস্যরা।

১৮ জুলাই সকালে তাকে দিল্লি পুলিশের একটি দল ধর্ণা মঞ্চ থেকে তুলে ভর্তি করে দেয় দিল্লির সরকারি সফদরজং হাসপাতালে।

এই ঘটনার পর থেকে তার স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এই প্রতিবাদ কর্মসূতে।

ভারতের অন্যতম দুর্গম অঞ্চল লাদাখে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও পানীয় জলের ব্যবস্থার জন্য একাধিক কাজ করার জন্য সুপরিচিত সোনাম ওয়াংচুক।

পরিবেশ ও শিক্ষাক্ষেত্রে তার অবদানের জন্য ২০১৮ সালে তাকে র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার দেওয়া হয়। এই পুরস্কারকে অনেকে এশিয়ার নোবেল বলেও আখ্যা দিয়ে থাকেন।

দিল্লির সফদরজং হাসপাতাল থেকে ওয়াংচুককে নিয়ে যাওয়া হয় গুরুগ্রামের এক বেসরকারি হাসপাতালে।

সিজেপির সংসদ অভিযান

সোনম ওয়াংচুককে দিল্লি পুলিশ গত শনিবার অনশন মঞ্চ থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার আগেই সংসদ ভবন অভিযানের ডাক দিয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি।

ওই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে দিল্লির প্রাণ কেন্দ্র কনট প্লেস, যন্তর মন্তর সহ আশপাশের এলাকায়।

বিক্ষোভকারীদের ওপরে লাঠি চার্জ আর কাঁদানে গ্যাসের শেল চার্জ করে পুলিশ। অনেক বিক্ষোভকারী যেমন আহত হন, তেমনই কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাও আন্দোলনকারীদের পাল্টা হামলায় আহত হন।

ওই প্রতিবাদ মিছিলে বিবিসি বাংলা গিয়ে দেখতে পায় যে, রাইসিনা রোডের উপর যে ব্যারিকেড, তা টপকিয়ে প্রতিবাদী জনতা পৌছে গেছে জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাছে।

বেলা গড়াতেই আন্দোলনকারীরা পৌঁছিয়ে যান সংসদ ভবনের কাছে রেল ভবন পর্যন্ত। সেখানে আগেই ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে রেখেছিল পুলিশ। সেখানে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোঁড়া হয়। প্রায় ঘণ্টাখানেকের চেষ্টায় জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

দুদিন পরে, বুধবার রাতে আবারও আন্দোলনকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে।

ভারতীয় সংবাদপত্রগুলোয় লেখা হয়েছে যে মূল জমায়েতের এলাকা দুদিক থেকে লোহার বেড়া দিয়ে কিছুটা ছোটো করে দিয়েছিল পুলিশ, তাই বহু বিক্ষোভকারীই মূল মঞ্চের দিকে না যেতে পেরে নানা জায়গায় ছোটো ছোটো জমায়েত করছিলেন।

এই জমায়েতগুলো ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ বুধবার সন্ধ্যায় কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে এবং লাঠিচার্জ করে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। এসময় পাল্টা আক্রমণ করা হয় এবং তাদের লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়া হয় বলে অভিযোগ করেছে পুলিশ।

বিক্ষোভ ভারতের নানা শহরে

সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা- ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এনট্রান্স টেস্ট বা 'নিট' এর প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়া এবং তার জেরে অন্তত ২০ জন পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার দায় নিয়ে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে দিল্লিতে একমাসেরও বেশি সময় ধরে যে আন্দোলন চলছে, তা ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্যান্য শহরেও।

মুম্বাই, কলকাতা, গুজরাত, তামিলনাডু, বিহারের পাটনা -সহ, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ দেখা গেছে।

আন্দোলনরতদের সমর্থনে কথা বলেছেন শাবানা আজমি, নাসিরুদ্দিন শাহ, অরিজিত সিং-সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি।

বুধবার বিহারের রাজধানী পাটনায় অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা)-এর বিক্ষোভকারীরা রাজভবনের দিকে এগোনোর চেষ্টা করলে তাদের থামাতে পুলিশ জল-কামান, কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে।

মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্ক, চৈত্যভূমি, চেম্বুর-সহ বিভিন্ন জায়গায় সিজেপির সমর্থনে সমাবেশ হয়েছে গত কয়েকদিনে। পুলিশের অনুমতি ছাড়াই এই সমাবেশ করা হচ্ছে- এই অভিযোগ ধরাপাকড়ও চলছে।

কলকাতাতেও বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ কর্মসূচি দেখা গেছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি বিশ্বিবিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা দিল্লিতে আন্দোলনরতদের পক্ষে প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন। পরবর্তী কয়েকদিনেও নানা কর্মসূচির কথা জানিয়েছে বিভিন্ন ছাত্র-যুব সংগঠন।

প্রধানমন্ত্রীর বার্তা

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকালে সামাজিক মাধ্যমে বার্তা দেন নরেন্দ্র মোদি।

তিনি লেখেন, আমাদের যুবসমাজের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নেই! প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িতদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে আমরা ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ ব্যাপারে সকল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য আমাদের ধারাবাহিক পদক্ষেপের এটা একটা অংশ। যারা আমাদের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার চেষ্টা করবে, তাদের রেহাই দেওয়া হবে না। দেশকে যুবকদের হিত এবং ভবিষ্যত আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

সূত্র: বিবিসি বাংলা