আগামী বছর পৃথিবীর কয়েকটি অঞ্চলে দেখা যাবে এক বিরল পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। কয়েক মিনিটের জন্য দিনের আলো মিলিয়ে গিয়ে অন্ধকার নেমে আসবে, আর সেই মহাজাগতিক দৃশ্যের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী পর্ব দেখা যাবে মিশরের ঐতিহাসিক শহর লুক্সরে। সেখানে প্রায় সাড়ে ছয় মিনিট সূর্য পুরোপুরি চাঁদের আড়ালে থাকবে। দীর্ঘস্থায়ী এই গ্রহণ ঘিরে ইতোমধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও পর্যটকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
২০২৭ সালের ২ আগস্ট দৃশ্যমান হতে যাওয়া এই বিরল সূর্যগ্রহণের মূল আকর্ষণ থাকবে উত্তর আফ্রিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব দেখা যাবে লুক্সরে, যেখানে টানা ৬ মিনিট ২৩ সেকেন্ড সূর্য পুরোপুরি ঢাকা পড়ে শহরটি অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, ২১১৪ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ আগামী আট দশকের মধ্যে পৃথিবীর বুকে এত দীর্ঘ সময় ধরে আর কোনো পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে না।
এই গ্রহণের পূর্ণতার পথ শুরু হবে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে। এরপর স্পেনের দক্ষিণাঞ্চল, জিব্রাল্টার ও মরক্কোর উত্তর প্রান্ত হয়ে এটি অতিক্রম করবে আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিশর, সৌদি আরব, ইয়েমেন ও সোমালিয়া, এবং পরিশেষে গিয়ে মিশবে ভারত মহাসাগরে। প্রায় ২৫৯ কিলোমিটার বা ১৬১ মাইল বিস্তৃত এই ছায়াপথের আওতায় পড়ায় লুক্সরের পাশাপাশি কাডিজ, ট্যাঙ্গিয়ার, ওরান, বেনগাজি ও জেদ্দার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোও কয়েক মিনিটের জন্য রাতের মতো অন্ধকারে ঢেকে যাবে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থানগুলোর মধ্যে লুক্সর অন্যতম। নীল নদের দুই তীরে গড়ে ওঠা এই শহরের এক পাশে কিংস ভ্যালি, অন্য পাশে কুইন্স ভ্যালি। ঠিক সেখানেই দুপুরের আকাশে সূর্য ঢেকে যাবে চাঁদের ছায়ায়।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী অধ্যাপক রজার ডেভিস বলছেন, এত দীর্ঘ সময়ের পূর্ণগ্রহণ পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা হবে অসাধারণ। ছয় মিনিট ২৩ সেকেন্ড যথেষ্ট সময়, যাতে চোখ অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। সাধারণত পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় উজ্জ্বল কয়েকটি তারা ও গ্রহ দেখা যায়। কিন্তু এবারের দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকারে আরও অনেক নক্ষত্র দেখা যেতে পারে বলে তিনি আশা করছেন।
লুক্সরে আবহাওয়াও অনুকূলে থাকার সম্ভাবনা বেশি। আগস্ট মাসে আকাশ সাধারণত মেঘমুক্ত থাকে। তবে সাহারা ও আরব মরুভূমি থেকে উড়ে আসা ধুলা কিছুটা সমস্যা তৈরি করতে পারে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে তাপমাত্রা। আগস্টে লুক্সরের দিনের তাপমাত্রা প্রায়ই ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। গ্রহণের সময় কিছুটা কমলেও ক্যামেরা ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির ওপর অতিরিক্ত তাপের প্রভাব পড়তে পারে।
স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৪০ মিনিটের কিছু পর আংশিক গ্রহণ শুরু হবে। পূর্ণগ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায় পৌঁছাবে আনুমানিক দুপুর ১টা ৫ মিনিটে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, গ্রহণ দেখতে আগ্রহী মানুষের বিপুল সমাগমই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। পূর্ণগ্রহণের পথ তুলনামূলক সরু হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো পর্যটক একই অঞ্চলে জড়ো হতে পারেন। হোটেল, সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হতে পারে।
ইতোমধ্যে লুক্সরের অনেক হোটেলের কক্ষ বুক হয়ে গেছে। বিভিন্ন ভ্রমণ প্যাকেজও দ্রুত পূর্ণ হচ্ছে। কিছু বিলাসবহুল প্যাকেজের খরচ জনপ্রতি কয়েক হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
মিশরের রাজধানী কায়রো পূর্ণ সূর্যগ্রহণের মূল পথের বাইরে থাকলেও সেখানে সূর্যের প্রায় ৯৪ শতাংশই ঢেকে যাবে। এই বিরল মহাজাগতিক ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে কায়রোভিত্তিক ন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড জিওফিজিকস ইতোমধ্যে ব্যাপক বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতি শুরু করেছে। এই লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির কোটামিয়া অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরিতে থাকা ৫০ টন ওজনের বিশালাকার টেলিস্কোপ প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।