ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের নতুন কৌশল

ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও কৃষিজমির পর এবার পশ্চিম তীরে শিল্পকারখানা, পাথরখনি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে। অগ্নিসংযোগ, ভারী যন্ত্রপাতি ধ্বংস, কর্মীদের ওপর হামলা এবং ব্যবসা বন্ধে চাপ দেওয়ার মতো ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এসব হামলার লক্ষ্য কেবল সম্পত্তি নষ্ট করা নয়; মানুষের জীবিকা সংকুচিত করে তাদের নিজ ভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য করা।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আল জাজিরা জানায়, রামাল্লার উত্তরে আইন সিনিয়া এলাকায় আল-ওমারি অ্যালুমিনিয়াম কারখানার কাছে আগুনে প্রায় ৫০ ডুনাম জলপাইবাগান পুড়ে যায়। এতে কারখানার আঙিনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের ধারাবাহিক হামলার অংশ বলে অভিযোগ করেছেন।

পশ্চিম তীরে জমি দখল ও সংঘাতের ক্ষেত্রে এতদিন বাড়িঘর, কৃষিজমি ও জলাধারকে কেন্দ্র করেই বেশি ঘটনা সামনে এসেছে। তবে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাকেন্দ্রে হামলা পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। কারণ একটি কারখানা বা খনি বন্ধ হয়ে গেলে শুধু মালিকই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন না; একই সঙ্গে শ্রমিক, সরবরাহকারী, পরিবহনকর্মী এবং তাদের পরিবারের আয়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

আইন সিনিয়া এলাকাতেই এর আগে একটি পাথর প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে ঢুকে ভারী যন্ত্রপাতিতে আগুন দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকের হিসাবে, এতে প্রায় ৭ লাখ ডলারের ক্ষতি হয়েছে। তার দাবি, এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের একটি আউটপোস্ট গড়ে ওঠার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির যানবাহন ও কার্যালয়ে হামলা এবং ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল।

হেবরনের দক্ষিণে আস-সামু এলাকাতেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক খালেদ আল-জারিরের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২১ আগস্ট প্রায় ৩০ জন বসতি স্থাপনকারী তার কারখানায় হামলা চালায়। এ সময় দুটি খননযন্ত্র, তিনটি পাথর কাটার মেশিন, তিনটি বুলডোজার ও একটি নিরাপত্তা কার্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

জারিরের দাবি, আগুনের ঘটনায় ভারী যন্ত্রপাতির ৯০ শতাংশের বেশি আর মেরামতযোগ্য নেই। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রায় ৫৫ জন মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কোনো এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অচল করে দেওয়া হলে সেখানে বসবাস করাও ক্রমে কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষ চাকরি হারায়, ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে না এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকতে বাধ্য হয়। দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি চললে অনেক পরিবার অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হতে পারে।

ফিলিস্তিনি Colonization and Wall Resistance Commission-এর তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুলাই ২০২৬-এ বসতি স্থাপনকারীদের ৭৯৮টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪০টি ছিল সম্পত্তি ক্ষতি ও জমি সমতল করার ঘটনা। এ ছাড়া ৬৭টি দখল ও চুরির ঘটনা এবং ৫ হাজার ২৭টি গাছ কাটা, নষ্ট করা বা বিষ প্রয়োগের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

পশ্চিম তীরের প্রশাসনিক কাঠামোও এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অসলো চুক্তির আওতায় অঞ্চলটিকে এরিয়া এ, বি, সি-এই তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়। এরিয়া বি-তে ফিলিস্তিনি বেসামরিক প্রশাসনের ভূমিকা থাকলেও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইসরায়েলেরও দায়িত্ব রয়েছে।

আইন সিনিয়াসহ পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় এরিয়া এ, বি, সি-দুই ধরনের অঞ্চলে ফিলিস্তিনি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘও এরিয়া বি-তে কৃষিজমি থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ এবং বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বসতি স্থাপনকারীদের তৎপরতা যদি এরিয়া সি-এর বাইরে ফিলিস্তিনি জনবসতিপূর্ণ এরিয়া বি-তেও আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে পশ্চিম তীরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং ভূখণ্ডটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।

পশ্চিম তীরে জমি কেবল বসবাসের জায়গা নয়, এটি মানুষের প্রধান অর্থনৈতিক সম্পদগুলোর একটি। কৃষিজমি, পাথরখনি, পশুপালন, কারখানা ও স্থানীয় ব্যবসা সবকিছুর সঙ্গেই ভূমির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে কোনো জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অর্থ শুধু ভৌগোলিক সীমানা বদলে দেওয়া নয়; একই সঙ্গে ওই জমি থেকে আয় ও জীবিকা অর্জনের সক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাগুলো তাই বিচ্ছিন্ন সম্পত্তি ধ্বংস কিংবা স্থানীয় সহিংসতার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কমছে। এর মধ্য দিয়ে পশ্চিম তীরে জমি, জীবিকা এবং জনসংখ্যাগত উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দিক সামনে আসছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে অর্থনীতিবিদ মোয়াইয়াদ আফানাহ বলেন, এ ধরনের হামলা বিনিয়োগের পরিবেশকে দুর্বল করে। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরের আগে থেকেই সংকটাপন্ন অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করে। ফলে শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে না, দীর্ঘমেয়াদে একটি এলাকার অর্থনৈতিক সক্ষমতাকেও দুর্বল করে দিতে পারে।