ইরানের সঙ্গে নতুন কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি ইরানের সঙ্গে বৈঠক করতে আগ্রহী নন; বরং তাঁর দাবি, আলোচনার জন্য তেহরানই আগ্রহ দেখাচ্ছে। এর মধ্যেই ওয়াশিংটন কাতার, ওমান ও পাকিস্তানকে জানিয়েছে—জুনে ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতার কাঠামোয় তারা আর ফিরতে চায় না। ফলে হরমুজ প্রণালি নিয়ে মধ্যস্থতাকারীদের কূটনৈতিক উদ্যোগ বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে।
জুনের ১৭ তারিখের সমঝোতায় মূলত একটি বিনিময় কাঠামো তৈরি হয়েছিল। ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেবে এবং পারমাণবিক ইস্যুতে অগ্রগতি দেখাবে—এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও ইরানের জব্দ সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল। দীর্ঘমেয়াদে ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিলের কথাও আলোচনায় ছিল। তবে সেটি সরাসরি তেহরানকে মার্কিন অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল না।
সমঝোতার পরও হরমুজ নিয়ে বিরোধ কাটেনি। ইরানের দৃষ্টিতে, প্রণালির ওপর দেশটির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল কোনো ধরনের বাধা, টোল বা একতরফা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই অব্যাহত থাকুক।
জুনের সমঝোতার একটি ধারায় ইরানকে ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও বিনা মাশুলে চলাচল নিশ্চিত করতে ‘সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা’ চালানোর কথা বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে হরমুজের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমান ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে আলোচনার কথাও ছিল।
কিন্তু দুই পক্ষই সমঝোতার ধারাগুলোকে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী ব্যাখ্যা করছে। ফলে যুদ্ধবিরতির পরও হরমুজ প্রশ্নে মৌলিক মতপার্থক্য থেকে গেছে।
ইরানের দাবি বনাম যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত
বর্তমান অচলাবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে ‘কে আগে ছাড় দেবে’-এই প্রশ্ন।
ইরান হরমুজে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ও বৃহত্তর সমঝোতার আগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নৌ অবরোধ বন্ধ, জব্দ সম্পদ ছাড় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ বা পুনর্গঠনে বড় ধরনের সহায়তা চায়। অন্যদিকে ওয়াশিংটন চায় ইরান হরমুজে জাহাজ চলাচলের ওপর চাপ কমাক এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বড় ধরনের ছাড় দিক।
ফলে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে এমন—ওয়াশিংটন চায় আগে ইরান ছাড় দিক, তেহরান চায় আগে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ প্রত্যাহার করুক।
এই পারস্পরিক শর্তই কূটনীতির সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ দুর্বল হয়ে পড়লেও কাতার, ওমান ও পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী তেহরান সফর করেছেন এবং ওমান হরমুজে জাহাজ চলাচল নিয়ে সম্ভাব্য একটি ব্যবস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। পাকিস্তানও মধ্যস্থতার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন জুনের কাঠামোয় ফিরতে না চাইলে মধ্যস্থতাকারীদের সামনে কাজটি আরও কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ তাদের এমন একটি সমাধান বের করতে হবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—কেউই প্রকাশ্যে বড় ধরনের পরাজয় স্বীকার না করেও সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে।
কূটনীতির দরজা কি পুরোপুরি বন্ধ?
এ মুহূর্তে দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে—এমন বলা হয়তো অতিরঞ্জিত হবে। কারণ যুদ্ধের মতো সংঘাতে কোনো পক্ষই অনির্দিষ্টকাল সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বহন করতে চায় না। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বর্তমান অবস্থান বলছে, দ্রুত সমঝোতার সম্ভাবনা এখন অনেকটাই কমে গেছে।
বিশেষ করে ট্রাম্প যদি জুনের সমঝোতার কাঠামোতে আর ফিরতে না চান এবং ইরানও নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ প্রত্যাহারের আগে হরমুজে ছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে মধ্যস্থতাকারীদের সামনে নতুন একটি চুক্তির কাঠামো তৈরি করা ছাড়া বিকল্প থাকবে না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো-হরমুজ কি কেবল একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ থাকবে, নাকি এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শক্তির লড়াইয়ের স্থায়ী দর-কষাকষির হাতিয়ারে পরিণত হবে?