কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) দুই দিনের সম্মেলনে জড়ো হয়েছেন চীন, ইরানসহ সদস্য দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ইতোমধ্যে সেখানে পৌঁছেছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও সোমবার (৩১ আগস্ট) সম্মেলনে যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এসসিও প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এই সম্মেলনে এক ডজনের বেশি দেশের নেতার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। রাশিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, মধ্য এশিয়ার চার দেশ এবং রাশিয়ার মিত্র বেলারুশ-এই জোটের ১০ সদস্যের মধ্যে রয়েছে।
বিশকেকে পৌঁছে শি জিনপিং কিরগিজস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ককে ‘সোনালি সময়’ বলে উল্লেখ করেছেন। ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়ার প্রভাবাধীন মধ্য এশিয়ায় চীনের প্রভাব বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে তাঁর এই সফরকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সম্মেলনের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে শি, পুতিন, পেজেশকিয়ান ছাড়াও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ অংশ নেবেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন কিরগিজস্তানের প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারভ। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানও এতে যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে, যদিও তুরস্ক এসসিওর আনুষ্ঠানিক সদস্য নয়।
পুতিন সম্মেলনের ফাঁকে পেজেশকিয়ান ও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবেন বলে জানিয়েছেন ক্রেমলিনের মুখপাত্র ইউরি উশাকভ। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর মস্কো ও তেহরানের মধ্যে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও গভীর হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মস্কো ও বেইজিংকে ইরানকে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। পুতিন-পেজেশকিয়ান বৈঠকের কয়েক দিন আগে সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফের মস্কো সফর নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলছে। মার্কিন গণমাধ্যমের ধারণা, ইউক্রেন ও ইরান ইস্যুতে রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়ে থাকতে পারে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে যাত্রা শুরু করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসসিওর রাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে। ১০ সদস্যের পাশাপাশি সংস্থাটির এখন ১৫টি ‘ডায়ালগ পার্টনার’ দেশ রয়েছে। এর মধ্যে তুরস্ক, সৌদি আরব ও কাতারও আছে। আফগানিস্তান ও মঙ্গোলিয়া রয়েছে পর্যবেক্ষক দেশের মর্যাদায়।
এসসিওর প্রতিষ্ঠাতা ঘোষণায় বলা হয়েছে, এই জোট ‘অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত কোনো জোট নয়’। তবে সাম্প্রতিক সম্মেলনগুলোতে পুতিন ও শি জিনপিং পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছেন।
বিশকেকের এবারের সম্মেলন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন এসসিওর কয়েকটি সদস্য দেশ সরাসরি যুদ্ধ বা বাণিজ্যিক সংঘাতের মধ্যে রয়েছে। ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধের পাশাপাশি চীন ও ভারতের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপও জোটটির সদস্যদের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
চীনের অন্যতম বড় তেল ক্রেতা ইরানকে লক্ষ্য করে চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্র স্বর্ণ, প্রযুক্তি, ডিজিটাল সম্পদ, বিমান চলাচল ও সমুদ্র পরিবহন খাতে দেশটির বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলাই এর লক্ষ্য বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষায় চীন জানিয়েছে, তারা নিজেদের স্বার্থ ‘দৃঢ়ভাবে রক্ষা’ করবে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা ইরানও বারবার বলে আসছে, অর্থনৈতিক চাপের কাছে তারা নতি স্বীকার করবে না। তবে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান স্বীকার করেছেন, দেশটি অর্থনৈতিক সংকটের মুখে রয়েছে।
২০২৩ সালে এসসিওতে যোগ দেয় ইরান। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ হাসান নাজমি এএফপিকে বলেন, তেহরান মনে করে, এ ধরনের জোটে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সংকটের সময়ে এসব জোট ইরানের সমস্যার সমাধানে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন।
এসসিওর দাবি, তাদের সদস্য দেশগুলো বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২৫ শতাংশ তাদের অংশ। কিন্তু জোটটির সদস্যদের মধ্যে স্বার্থের পার্থক্যও রয়েছে। মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে রাশিয়া ও চীনের প্রতিযোগিতা রয়েছে। একই সঙ্গে চীন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেও বিভিন্ন সময়ে টানাপোড়েন দেখা গেছে।