রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করলেই ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান হবে না বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে পশ্চিমা চাপের মধ্যেই তিনি নয়াদিল্লির অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনো দেশ তেল কিনছে কি না—শুধু সেই সিদ্ধান্ত দিয়ে এত বড় একটি যুদ্ধের সমাধান সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে জয়শঙ্কর বলেন, ইউক্রেনের যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে প্রবেশ করেছে। তাঁর যুক্তি, কোনো দেশ রাশিয়ার কাছ থেকে তেল বা অ্যালুমিনা কিংবা অন্যান্য খনিজ কিনছে বা কিনছে না—এ কারণে এই সংঘাতের অবসান হবে না।
জয়শঙ্করের এই মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল কেনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ অব্যাহত রয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া তুলনামূলক কম দামে তেল বিক্রি শুরু করলে ভারত বড় ক্রেতায় পরিণত হয়। এর ফলে ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলো সস্তা অপরিশোধিত তেল পাওয়ার সুযোগ পায়।
ভারতের অবস্থান হলো—দেশটির বিপুল জনগোষ্ঠীর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি সংগ্রহ করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের অনুমতির ওপর নির্ভর করে নিজেদের জ্বালানি আমদানি নীতি নির্ধারণ করবে না।
ভারতীয় কর্মকর্তারা এর আগে যুক্তি দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যে উৎস থেকে সবচেয়ে ভালো দামে তেল পাওয়া যায়, সেখান থেকেই তেল কেনা দেশের জাতীয় স্বার্থের অংশ। রাশিয়ার তেল আমদানির ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েন
রুশ তেল কেনাকে কেন্দ্র করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও চাপ তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে রাশিয়ার জ্বালানি আয়ের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করছে। সেই নীতির সঙ্গে ভারতের বিপুল রুশ তেল আমদানি সাংঘর্ষিক বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে নয়াদিল্লি বলছে, রাশিয়া থেকে তেল আমদানি শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়; এর সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি মূল্য, শিল্প উৎপাদন ও ভোক্তাদের ওপর খরচের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা শুরুর পর ভারত রুশ তেলের অন্যতম বড় ক্রেতায় পরিণত হয় এবং তুলনামূলক কম দামে অপরিশোধিত তেল কেনার মাধ্যমে ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলো উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় করেছে।
যুদ্ধ থামানোর দায়িত্ব কার?
জয়শঙ্করের বক্তব্যের মূল বার্তা হলো—ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান করতে হলে যুদ্ধরত পক্ষগুলোকেই আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এর আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে যুদ্ধের অবসান ও শান্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
নয়াদিল্লি একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইউক্রেনের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রেখেছে। ভারত নিজেকে সরাসরি কোনো পক্ষের সামরিক জোটে না জড়িয়ে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণকারী দেশ হিসেবে তুলে ধরতে চায়।
জয়শঙ্করের বক্তব্য সেই ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এরই প্রতিফলন। তাঁর মতে, ভারতের জাতীয় স্বার্থকে অন্য দেশের ভূরাজনৈতিক চাপের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
রুশ তেলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব
ভারতের জন্য রুশ তেলের আকর্ষণের অন্যতম কারণ হলো মূল্য। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর রাশিয়া নতুন বাজার খুঁজতে গিয়ে এশিয়ার বড় ক্রেতাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ভারত সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে।
রয়টার্সের হিসাবে, রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানির ফলে ভারতীয় ক্রেতারা কয়েক বছরে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে। তবে একই সঙ্গে এই বাণিজ্য ভারতের ওপর পশ্চিমা চাপও বাড়িয়েছে।
ফলে নয়াদিল্লির সামনে এখন দুটি বিষয়কে একসঙ্গে সামলানোর চ্যালেঞ্জ—একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা।
ভারতের বক্তব্য, কোনো একটি দেশের চাপের কারণে জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর।
‘ভারত নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে’
রুশ তেল নিয়ে বিতর্কে ভারতের অবস্থান ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। নয়াদিল্লি বলছে, যুদ্ধ বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভারতের কোনো দ্বিমত নেই; কিন্তু রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করলেই যুদ্ধ থেমে যাবে—এমন ধারণার সঙ্গে তারা একমত নয়।
জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক মন্তব্যে সেই অবস্থানই আবার সামনে এসেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধের অবসান নির্ভর করবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের ওপর, কোনো একটি দেশের তেল কেনাবেচার সিদ্ধান্তের ওপর নয়।
ফলে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে ভারত আপাতত নিজের জাতীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। একই সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কও ধরে রাখার চেষ্টা করছে নয়াদিল্লি।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান মেরুকরণের মধ্যে ভারতের এই অবস্থানকে অনেকেই ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এর উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে অংশীদারিত্ব—দুই দিকই সামলে এগিয়ে যাওয়াই ভারতের বর্তমান কূটনৈতিক কৌশল।