'ইরান যুদ্ধে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্রিটেনের অর্থনীতি'

ইরান যুদ্ধের প্রভাব ব্রিটেনের অর্থনীতিতে পড়ছে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির অর্থমন্ত্রী জন হিলি। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হিলি বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে যা ঘটছে, তা মূল্যস্ফীতিতে আঘাত করছে, প্রবৃদ্ধিতে আঘাত করছে এবং ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়াচ্ছে।” তিনি বলেন, বিশ্ব এখন আরও বিপজ্জনক ও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে এবং এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যকে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

আগামী বাজেটকে সামনে রেখে হিলি বলেন, তাঁর প্রথম বাজেটের পর যুক্তরাজ্যের অর্থব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা মোকাবিলার জন্য একটি ‘ফিসকাল বাফার’ বা আর্থিক সুরক্ষা বলয় রাখতে চান। তবে অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে থাকলে কর বাড়ানো কিংবা সরকারি ব্যয় কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ব্রিটেনের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের ওপরে রয়েছে। পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় সাধারণ ব্রিটিশ পরিবারের ব্যয়ও বাড়ছে।

জ্বালানির উচ্চমূল্য শুধু ভোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি করছে না, মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাও বাড়াচ্ছে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটিশ ব্যবসাগুলো আগামী এক বছরে গড়ে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ হারে দাম বাড়ানোর প্রত্যাশা করছে। মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি এবং উচ্চ জ্বালানি ব্যয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার কমানোর পথও কঠিন করে তুলছে।

সরকারের ঋণব্যয়ও নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ব্রিটিশ ১০ বছরের সরকারি বন্ডের সুদহার ৫ দশমিক ২৯৪ শতাংশে উঠে যায়, যা প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। উচ্চ বন্ড ফলন মানে সরকারের নতুন ঋণ নেওয়া এবং বিদ্যমান ঋণ পুনঃঅর্থায়নের খরচও বেড়ে যাওয়া।

এর ফলে সরকারের বাজেটের জন্য যে ‘ফিসকাল হেডরুম’ বা অতিরিক্ত ব্যয়ের সুযোগ থাকে, সেটিও সংকুচিত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতিতে এই আর্থিক ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। ফলে অর্থমন্ত্রীকে বাজেটে কর বৃদ্ধি অথবা ব্যয় সংকোচনের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলিও সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি ঋণ ও ঋণব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, দুর্বল উৎপাদনশীলতা, জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির মতো দীর্ঘমেয়াদি চাপের সঙ্গে এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত মূল্যস্ফীতির অনিশ্চয়তাও যুক্ত হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিনিয়োগ ও সরকারি ব্যয় প্রয়োজন, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় সামলাতে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হচ্ছে।

হিলি জানিয়েছেন, তাঁর বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য হবে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা তৈরি করা। আঞ্চলিক উন্নয়ন, অবকাঠামো ও সরকারি সেবায় বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কতদিন স্থায়ী হবে এবং তেলের দাম কোথায় গিয়ে স্থির হবে—তার ওপর ব্রিটেনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বড় অংশ নির্ভর করছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির উচ্চমূল্য মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে, একই সঙ্গে দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ সুদহার সরকারের আর্থিক চাপ বাড়াতে পারে।

ফলে ইরান যুদ্ধ এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংকট নয়; এর অভিঘাত ব্রিটেনের অর্থনীতি, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারের বাজেট পরিকল্পনাতেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।