লোহিত সাগরের প্রবেশপথে হুথিদের হামলা, ইয়েমেনে নিহত ১২৯

ইয়েমেনে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদাব প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়ার লক্ষ্যে হুথি বিদ্রোহীদের বড় ধরনের সামরিক অভিযানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১২৯ জনে দাঁড়িয়েছে। গত বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া তীব্র সংঘর্ষকে কয়েক বছরের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে প্রাণঘাতী লড়াই হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। সামরিক ও চিকিৎসা সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে এএফপি।

এএফপির তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর ৬৬ সদস্য, অন্তত ৬২ জন হুথি যোদ্ধা এবং একজন বেসামরিক নাগরিক রয়েছেন। তবে সংঘর্ষ চলতে থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় স্থল অভিযান শুরু করে। এর পাশাপাশি রকেট ও ড্রোন হামলা চালানো হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল বাব আল-মানদাব প্রণালির কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড ও উঁচু অবস্থান দখল করা। সামরিক সূত্রগুলোর দাবি, হুথিরা সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোকাকে বিচ্ছিন্ন করারও চেষ্টা করছে।

বাব আল-মানদাব লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ। এ পথ দিয়ে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে জাহাজ চলাচল করে এবং এটি সুয়েজ খালের সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্যপথকে যুক্ত করে। ফলে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইয়েমেনের সরকারি সামরিক সূত্রগুলো এএফপিকে জানিয়েছে, হুথিরা এমন উঁচু এলাকাগুলো দখল করতে চাইছে, যেখান থেকে বাব আল-মানদাবের আশপাশের নৌপথের ওপর নজর রাখা এবং প্রয়োজনে বাণিজ্যিক জাহাজকে হুমকি দেওয়া সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে মোকা বন্দরকে সরকারি নিয়ন্ত্রিত অন্যান্য এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলছে বলে তাদের দাবি।

হুথিদের এই অভিযান এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

২০২২ সালে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে বড় আকারের সংঘর্ষ কম ছিল। তবে চলতি বছরের জুলাইয়ে পরিস্থিতির আবার অবনতি ঘটে এবং দেশটি বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে হুথিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর লড়াই নতুন করে তীব্র হয়েছে।

হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকার দেশের দক্ষিণ ও অন্যান্য কিছু অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের সমর্থন পেয়ে আসছে।

সাম্প্রতিক সংঘর্ষে হুথিদের স্থল হামলার পাশাপাশি রকেট ও ড্রোন ব্যবহারের ফলে লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। এএফপির সূত্রগুলো বলছে, সংঘর্ষের মাত্রা ও হতাহতের সংখ্যা কয়েক বছরের মধ্যে নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হুথিরা যদি বাব আল-মানদাবের কাছাকাছি কৌশলগত উচ্চভূমি বা মোকা এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে পারে, তাহলে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ও সৌদি আরবের সঙ্গে ভবিষ্যৎ দর-কষাকষিতে তাদের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

ইয়েমেনের নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা পরিস্থিতি তাই শুধু দেশটির দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের আরেকটি অধ্যায় নয়। হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মানদাবও যদি সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যপথে আরও গভীর হতে পারে।