৫ বছর আগে যে সংকটের ধারণা করেছিলো ইরান, আজ তা বাস্তব

পাঁচ বছরেরও বেশি আগে ইরানের সরকারি পরিকল্পনাকারীরা দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে যে আশঙ্কাজনক পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, ২০২৬ সালের বাস্তবতা তার সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে যাচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতি কতটা বাড়তে পারে এবং ইরানি মুদ্রা কতটা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে—তখনকার একটি সরকারি অর্থনৈতিক মডেলে তার হিসাব করা হয়েছিল। বর্তমান সংকট সেই পূর্বাভাসের অনেকটাই বাস্তবে পরিণত করেছে।

ইরানের নিজস্ব সরকারি পরিকল্পনাকারীদের তৈরি ওই পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে চলতি ইরানি বছরে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৬৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই পরিস্থিতিতে মার্কিন ডলারের বিনিময়মূল্য ১ লাখ ৭৮ হাজার তুমান পর্যন্ত উঠতে পারে বলেও মডেলটিতে অনুমান করা হয়েছিল।

পাঁচ বছর আগে করা সেই হিসাব এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে, কারণ নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অবরোধের সম্মিলিত চাপে ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে গভীর সংকটে রয়েছে। বিশেষ করে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত দেশটির তেল রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রার আয় এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বড় ধরনের আঘাত করেছে।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি কার্যত থমকে গেছে। মার্চে যেখানে ইরানের অপরিশোধিত তেল লোডিং প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল দৈনিক ছিল, আগস্টে তা কমে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫৫ হাজার ব্যারেলে নেমে আসে।

তেল রপ্তানি ইরানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রপ্তানি কমে যাওয়ার অর্থ হলো সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার আয় কমে যাওয়া এবং আমদানি, সরকারি ব্যয় ও মুদ্রাবাজারের ওপর চাপ আরও বাড়া। অর্থনৈতিক সংকট যত গভীর হচ্ছে, ততই মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ছে।

চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। রয়টার্সের হিসাবে, জুলাইয়ে ইরানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বছরওয়ারি ১২৮ শতাংশে পৌঁছেছিল। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির চাপ সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

এ অবস্থায় পাঁচ বছর আগের সরকারি পূর্বাভাসটি বিশেষ তাৎপর্য পাচ্ছে। কারণ তখনকার পরিকল্পনাকারীরা মূলত একটি দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার পরিস্থিতি ধরে হিসাব করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধ, তেল রপ্তানিতে বাধা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিঘ্ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে সংকট।

ইরানের অর্থনীতিতে এর প্রভাব শুধু সরকারি হিসাবেই সীমাবদ্ধ নেই। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, মুদ্রার মূল্য এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা—সব ক্ষেত্রেই এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। দেশটির ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও যুদ্ধ সেই চাপকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

অন্যদিকে ইরানের সরকার এখন অর্থনৈতিক সংকট সামলাতে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু তেল রপ্তানি সীমিত থাকা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সংকুচিত হওয়ায় সরকারের বিকল্পও সীমিত হয়ে পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে গিয়ে মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানো হলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

তবে পাঁচ বছর আগের পূর্বাভাস পুরোপুরি ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ ছিল—এমনটা বলা ঠিক হবে না। এটি ছিল নির্দিষ্ট কিছু অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ধরে তৈরি একটি মডেল। বাস্তবে যুদ্ধ ও অবরোধের মতো অতিরিক্ত সংকট যুক্ত হওয়ায় অর্থনীতির গতিপথ আরও জটিল হয়েছে। তবু পূর্বাভাসের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার এতটা মিল ইরানের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ব্যর্থতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ সচল রাখা। তেল রপ্তানি যদি দীর্ঘ সময় ধরে সীমিত থাকে, তাহলে অর্থনীতিতে ডলার সংকট আরও গভীর হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে আমদানি ব্যয়, খাদ্য ও ওষুধের দাম এবং জাতীয় মুদ্রার বিনিময়মূল্যের ওপর।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ ইতোমধ্যে ইরানের অর্থনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করেছে এবং বাণিজ্য ও মূল্যস্তরের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে।

ফলে পাঁচ বছর আগে ইরানের পরিকল্পনাকারীরা যে সতর্কবার্তা কাগজে লিখেছিলেন, সেটি এখন আর কেবল একটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট নয়। নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ ও তেল রপ্তানির সংকট একসঙ্গে দেশটির অর্থনীতিকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে সেই পুরোনো হিসাবের অনেক সংখ্যাই বাস্তবতার সঙ্গে আশঙ্কাজনকভাবে মিলে যাচ্ছে।

পাঁচ বছর আগের কাগজে আঁকা অর্থনৈতিক সংকট যেন ২০২৬ সালে এসে ইরানের বাস্তব জীবনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র: ইরানিয়ান্তি