ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধে ইরানকে ‘কাবু করা’ সম্ভব নয়

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক লুসিয়ানো জাকারার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই দেশই চলমান সংঘাতের মধ্যস্থতাকারীদের বিভিন্ন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “দুই পক্ষই বলছে, তাদের ওপর হামলা হলে তারা পাল্টা হামলা বন্ধ করবে না। ফলে আমরা এমন এক পাল্টাপাল্টি প্রতিশোধের চক্রে আটকে পড়েছি, যার কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না।”

জাকারার বলেন, পরিস্থিতি উত্তেজনামুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে নতুন করে ভাবতে কিংবা আলোচনায় বসতে—কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত প্রস্তুত নয়।

তার মতে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি নিষেধাজ্ঞা এবং নৌ অবরোধও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছেন, তা পূরণের জন্য যথেষ্ট বলে মনে হচ্ছে না।

জাকারার ব্যাখ্যা করেন, ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা হচ্ছে অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে দেশটির অর্থনৈতিক কাঠামো কার্যত “শ্বাসরুদ্ধ” হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ইরানের তেলবাহী জাহাজ ও তেল স্থাপনায় সরাসরি হামলা চালানোও চাপ সৃষ্টির কৌশলের আরেকটি অংশ বলে তিনি মনে করেন।

প্রতিশোধের চক্রে আটকে দুই পক্ষ

বিশ্লেষকের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই একে অপরের হামলার জবাব দেওয়ার নীতি অনুসরণ করছে। ফলে সামরিক পাল্টাপাল্টি হামলা যত বাড়ছে, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ তত সংকুচিত হচ্ছে।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ ও নৌ অবরোধের মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে ইরানও হামলার জবাব দেওয়ার অবস্থান থেকে সরে আসছে না। এর ফলে সংঘাতটি একটি ‘টিট-ফর-ট্যাট’ বা পাল্টা প্রতিশোধের ধারাবাহিকতায় পরিণত হয়েছে।

জাকারার মতে, এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—কোনো পক্ষই আপাতত উত্তেজনা কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় ছাড় দিতে বা নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা বিবেচনা করতে চাইছে না।

অর্থনৈতিক চাপ কতটা কার্যকর?

ইরানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা অতীতেও ইরানের তেল রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। গবেষণাতেও দেখা গেছে, ২০১৮ সালের পর পুনর্বহাল করা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছিল।

তবে জাকারার বক্তব্যের মূল বিষয় হলো—অর্থনৈতিক দুর্বলতা মানেই রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ নয়।

ইরানের অর্থনীতি চাপের মুখে পড়লেও দেশটি এখনও বিকল্প বাণিজ্যপথ, তেল বিক্রির বিকল্প ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

ফলে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য যদি ইরানকে সম্পূর্ণভাবে নতি স্বীকারে বাধ্য করা হয়, তাহলে সেই কৌশল কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

তেল ও সমুদ্রপথেও চাপ

ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হচ্ছে তেল ও সমুদ্রপথ। হরমুজ প্রণালি ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় তেলবাহী জাহাজের চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এতে একদিকে ইরানের তেল রপ্তানির ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

অর্থাৎ ইরানকে চাপে ফেলতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন এবং উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তার মতো বিষয় বিবেচনা করতে হচ্ছে।

এই বাস্তবতাই সংঘাতটিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

আলোচনার পথই কি শেষ সমাধান?

জাকারার বিশ্লেষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হলো—সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ যতই বাড়ানো হোক, শেষ পর্যন্ত সংঘাতের স্থায়ী সমাধান রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই আসতে পারে।

কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়। এক পক্ষ চাপ বাড়িয়ে ইরানকে দুর্বল করতে চাইছে, অন্য পক্ষ হামলার জবাব দিয়ে নিজের প্রতিরোধক্ষমতা প্রদর্শন করছে।

ফলে প্রতিশোধের এই চক্র যদি ভাঙা না যায়, তাহলে নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের পাশাপাশি সামরিক সংঘাতও আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আর সেই কারণেই প্রশ্ন উঠছে—ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলা সম্ভব হলেও, শুধু নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধ দিয়ে কি দেশটিকে শেষ পর্যন্ত ‘কাবু’ করা সম্ভব?

লুসিয়ানো জাকারার বিশ্লেষণ বলছে, অন্তত বর্তমান পরিস্থিতিতে এর উত্তর না।