ট্রাম্পের মধ্যবর্তী নির্বাচনি সম্মেলন

কারও কাছে উদ্দীপনা, কারও চোখে ‘সার্কাস’

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভোটারদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারবেন বলে এখনো বিশ্বাস রয়েছে ৫৮ বছর বয়সী কোডি জনসনের। তবে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টির মধ্যবর্তী নির্বাচনি সম্মেলন নিয়ে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে রয়েছে ভিন্নমত। কারও কাছে এটি ভোটারদের উজ্জীবিত করার কার্যকর উদ্যোগ, আবার কারও চোখে এটি নিছক ‘সার্কাস’। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।

আগামী নভেম্বরে আইনসভা নির্বাচনের আগে ভোটারদের সংগঠিত করতে রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির উদ্যোগে প্রথমবারের মতো এ ধরনের মধ্যবর্তী নির্বাচনি সম্মেলনের আয়োজন করা হচ্ছে। তবে সম্মেলনটি ট্রাম্পকেন্দ্রিক হওয়ায় এর রাজনৈতিক গুরুত্বও বাড়ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার কমলেও নির্বাচনে তার নাম সরাসরি ব্যালটে থাকছে না। তারপরও পুরো নির্বাচনি প্রচারণাজুড়ে তার প্রভাব স্পষ্ট।

কৃষিপণ্যের বাজারে কথা বলার সময় রিপাবলিকান ভোটার ও পাথরের খনি ব্যবসায়ী জনসন বলেন, ‘মানুষ ট্রাম্পকে দেখতে বহু দূর থেকে আসবে।’ জুনে ট্রাম্পের তড়িঘড়ি করে ঘোষণা দেওয়া এই সম্মেলন টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের উত্থান ঠেকাতে রিপাবলিকানদের প্রয়োজনীয় গতি এনে দিতে পারে বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রার্থী জেমস তালারিকোর নেতৃত্বে উদারপন্থিদের উত্থান ঠেকিয়ে রাজ্যজুড়ে কয়েক দশকের রক্ষণশীল নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। জনসন বলেন, ‘টেক্সাস ধীরে ধীরে বেগুনি রাজ্যের দিকে যাচ্ছে। এটি অবশ্যই কাজে দেবে। ট্রাম্প ভোটারদের উজ্জীবিত করতে পারেন।’

তবে ডালাস শহরের একটি পার্কে কুকুর নিয়ে হাঁটতে বের হওয়া ২৯ বছর বয়সী শানিয়া স্পিয়ার্সের মত ভিন্ন। নিজেকে দলীয় আনুগত্যের চেয়ে নীতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া ভোটার হিসেবে পরিচয় দেওয়া এক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিপণনকর্মী মনে করেন, সম্মেলনটি টেক্সাসের ভোটারদের অসন্তোষ কতটা দূর করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটের নেতৃত্ব এবং ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ নিয়ে অসন্তোষের পাশাপাশি নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য ও জ্বালানির দাম নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ রয়েছে। স্পিয়ার্স বলেন, ‘এটা শুধু বিনোদন। এটা একটা সার্কাসের মতো।’

আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে টেক্সাস গুরুত্বপূর্ণ ময়দানে পরিণত হয়েছে। ডালাসে সম্মেলনের আয়োজন সেই গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। সাউদার্ন মেথডিস্ট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জে ম্যাথিউ উইলসনের মতে, টেক্সাস দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের ‘রেড স্টেট মডেল’-এর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। কম কর, কম সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিকভাবে রক্ষণশীল নীতিই এই মডেলের বৈশিষ্ট্য।

গত তিন দশক ধরে টেক্সাসের সিনেট, প্রতিনিধি পরিষদ ও গভর্নরের কার্যালয় রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে। ১৯৯৪ সালের পর কোনো ডেমোক্র্যাট রাজ্যজুড়ে কোনো নির্বাচিত পদে জয় পাননি। উইলসন বলেন, ‘রিপাবলিকানদের কল্পনায় টেক্সাস তাদের নীতির একটি আদর্শ রাজ্য হিসেবে খুব গুরুত্বপূর্ণ।’ রাজ্যটিতে বিপুলসংখ্যক রিপাবলিকান দাতা রয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ২০২৪ সালের নির্বাচনে লাতিনো ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের সমর্থন বৃদ্ধির কেন্দ্রও ছিল টেক্সাস। তার মতে, টেক্সাসে ট্রাম্প তার সমর্থকদের কাছ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা পাবেন। তবে সম্মেলনের স্থান যে একই সঙ্গে রাজ্যটিতে রিপাবলিকানদের অবস্থান যে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, সেটিও তুলে ধরছে।

বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী তালারিকো টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনের সঙ্গে এগিয়ে রয়েছেন অথবা সমানে সমান অবস্থানে আছেন। টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাক্সটনের বিরুদ্ধে নানা কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে। রিপাবলিকান প্রাইমারিতে বর্তমান সিনেটর জন কর্নিনকে বাদ দিয়ে প্যাক্সটনকে ট্রাম্পের সমর্থন করায় নির্বাচনি লড়াইয়ে ব্যক্তিগত মাত্রাও যুক্ত হয়েছে।

অন্যদিকে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র গভর্নর অ্যাবট ডেমোক্র্যাটিক অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি জিনা হিনোজোসার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। সীমান্তবর্তী তিনটি মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ আসনেও নভেম্বরে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি আসন বর্তমানে রিপাবলিকানদের দখলে। ডালাসের ৪১ বছর বয়সী বারটেন্ডার ও ডেমোক্র্যাট ভোটার গ্রিফিন ব্ল্যাকবার্ন বলেন, ডালাসে সম্মেলন আয়োজনই দেখিয়ে দিচ্ছে যে রিপাবলিকানরা উদারপন্থিদের পাল্টা প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমার মনে হয় এই আয়োজনটা দেখাচ্ছে তারা কতটা ভীত ও চাপে আছে। আর মানুষ রিপাবলিকান পার্টিকে কীভাবে দেখছে, সেটাও এর মাধ্যমে বোঝা যায়।’

নীতিগত দিক থেকেও টেক্সাস ট্রাম্পের অনেক আগ্রাসী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। সমর্থকদের কেউ কেউ মনে করেন, এসব নীতি দেশজুড়ে ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি পরীক্ষামূলক রূপ। অভিবাসনবিষয়ক সংগঠন রেইসেস টেক্সাসের পাবলিক অ্যাফেয়ার্স পরিচালক হাভিয়ের হিদালগো বলেন, ‘আপনি অনেক সময় শুনবেন, টেক্সাস এসব নীতির পরীক্ষাগার বা পাইলট প্রকল্পের জায়গা।’

তিনি বলেন, গভর্নর অ্যাবটের প্রশাসন স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফেডারেল অভিবাসন আইন প্রয়োগে যুক্ত করতে চাপ দিয়েছে। ২৮৭(জি) চুক্তির আওতায় স্থানীয় পুলিশকে এ ধরনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প ফেডারেল অর্থায়নকে কাজে লাগিয়ে অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে অভিবাসন ও ভোটাধিকারসংক্রান্ত ছাড় আদায়ের উদ্যোগ নেওয়ার আগেই টেক্সাসে এ প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টেক্সাস এমন আইনও করেছে, যার আওতায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। পাশাপাশি কাগজপত্র ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সন্দেহে স্থানীয় পুলিশকে মানুষদের থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদেরও সুযোগ দেওয়া হয়। অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে বর্ণভিত্তিক নজরদারিকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে।

ভোটাধিকার নিয়েও টেক্সাসে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। ভোটার পরিচয়পত্র ও ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজ্যটির নিয়ম তুলনামূলক কঠোর। ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিসের মতে, ২০২১ সালে ডাকযোগে ভোটে আরও বিধিনিষেধ আরোপ করা আইনের কারণে লাতিনো, এশীয় ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের ব্যালট তুলনামূলক বেশি বাতিল হয়েছে।

ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দিয়ে টেক্সাসই প্রথম অঙ্গরাজ্য হিসেবে মধ্যবর্তী দশকেই কংগ্রেসের নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করেছে। এর ফলে আরও পাঁচটি আসন রিপাবলিকানদের দখলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব কালার্ড পিপল (এনএএসিপি) এই পদক্ষেপকে ‘অসাংবিধানিক বর্ণভিত্তিক নির্বাচনি সীমানা পুনর্বিন্যাস’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তবে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট তা বহাল রেখেছে।

হিদালগো অবশ্য তালারিকোর জনপ্রিয়তাকে কোনো একক ইস্যুতে গণভোট হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তবে তার মতে, এটি রাজ্যে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত হতে পারে। তিনি বলেন, ‘ভোটাররা প্রার্থীদের দেখবেন এবং বুঝতে চেষ্টা করবেন কে আরও বেশি ক্ষতি করার সম্ভাবনা কম।’

মধ্যবর্তী নির্বাচনের শেষ সময়ে ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির জন্য কতটা ক্ষতির কারণ হতে পারেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। কিছু জনমত জরিপ অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার ২০ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত কমেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জনপ্রিয়তা হারানো ইরান যুদ্ধ, যার কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য ট্রাম্প বোঝা হয়ে উঠতে পারেন।

তবে হিউস্টনের বেকার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মার্ক জোন্স মনে করেন, টেক্সাসের এই সম্মেলন দেখাচ্ছে রিপাবলিকানদের জন্য ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার সুযোগ নেই। জোন্স বলেন, ‘সাধারণত কোনো অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্টের সময়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের প্রার্থীরা প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব নয়। বিশেষ করে তার দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি রিপাবলিকান পার্টি ও দলটির ভাবমূর্তির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছেন।’ তার মতে, ‘আমার মনে হয়, পুরো যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকানরা, বিশেষ করে টেক্সাসের রিপাবলিকানরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রেসিডেন্টকে আলিঙ্গন করাই তাদের সেরা কৌশল। তারা আশা করছেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প যেসব ভোটারকে মাঠে নামাতে পেরেছিলেন, এবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ব্যালটে ট্রাম্পের নাম না থাকলেও তাদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারবেন।’

তবে ডালাসের কেন্দ্রীয় এলাকার একটি ফুড কোর্টে ভিয়েতনামি খাবার খেতে থাকা ৫৪ বছর বয়সী প্যাট ফার্গুসনের এই সম্মেলন নিয়ে তেমন আস্থা নেই। নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনীর সাবেক এই সদস্য জীবনে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট দুই দলকেই ভোট দিয়েছেন। ফার্গুসন বলেন, ‘সম্মেলন এমন বিষয়গুলোর ওপর প্রভাব ফেলছে না, যেগুলো আসলে ভোটারদের সিদ্ধান্ত বদলাবে।’ তিনি বলেন, ‘মানুষ নিজের অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে ভোট দেয়। তারা উচ্চ তেলের দামের প্রভাব অনুভব করছে। তারা শুল্কের প্রভাবও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনুভব করছে।’ ফার্গুসনের মতে, ‘২০২৪ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা এভাবেই সুযোগ হারিয়েছিল। রিপাবলিকানদের জন্য এখন এসব বলা কঠিন যে সবকিছু দারুণ চলছে, এটাই ঠিক যেভাবে চলা উচিত।’

জেএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত