মার্কিন নৌ অবরোধের অর্থনৈতিক চাপ শুধু নিজের ওপর সীমাবদ্ধ না রেখে তা যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর ছড়িয়ে দিতে সমুদ্রপথে পাল্টা চাপ বাড়াচ্ছে ইরান। তেহরানের নতুন কৌশলের লক্ষ্য এখন শুধু হরমুজ প্রণালি নয়; এর প্রভাব ও ঝুঁকি ছড়িয়ে পড়তে পারে উপসাগরীয় অঞ্চল, ওমান সাগর এবং আরব সাগরের বিস্তৃত জলসীমায়।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ওয়েবসাইট নূর নিউজ বুধবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, সাম্প্রতিক উত্তেজনা মার্কিন অবরোধের প্রচলিত কৌশলকেই উল্টে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, মার্কিন নৌ অবরোধের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের তেল রপ্তানি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে দুর্বল করা। কিন্তু এখন দুই পক্ষই ট্যাংকার ও সামরিক জাহাজে হামলা চালাচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে অবরোধের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য শুধু ইরানকেই বহন করতে হচ্ছে না।
১০ জাহাজে হামলার দাবি
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি বুধবার দাবি করেছে, পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে মার্কিন হামলার জবাবে তারা দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, আটটি তেলবাহী ট্যাংকার এবং ইরানের নির্ধারিত নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করা আরও ১০টি ‘লঙ্ঘনকারী জাহাজে’ হামলা চালিয়েছে।
তবে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ এ দাবি অস্বীকার করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তাদের যুদ্ধজাহাজে চালানো হামলার কোনোটি সফল হয়নি।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করার কথা জানিয়েছিল। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরান বারবার মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলার চেষ্টা করার পরই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ফলে সাম্প্রতিক কয়েক দিনের পাল্টাপাল্টি হামলা ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক উত্তেজনাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও। বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
হরমুজের বাইরে সংঘাত ছড়ানোর হুমকি
ইরান এখন সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধি আরও বাড়ানোর হুমকি দিচ্ছে।
আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি জানিয়েছেন, নতুন একটি নিষিদ্ধ জলসীমা নির্ধারণ করা হবে। এটি চাবাহার দিক থেকে শুরু হয়ে ওমান সাগর ও আরব সাগরের কিছু অংশ পেরিয়ে হরমুজমুখী নৌপথ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। তবে এর সুনির্দিষ্ট স্থানাঙ্ক এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
এর অর্থ হলো, হরমুজ প্রণালিতে চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ইরান চাইলে তার নজরদারি ও বাধা দেওয়ার পরিধি আরও বিস্তৃত সমুদ্রপথে নিয়ে যেতে পারে।
আইআরজিসি কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দর এবং নোঙর এলাকায় অবস্থানরত ট্যাংকার ও অন্যান্য জাহাজকেও সরে যাওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছে।
মোহেব্বির ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের অনুমতি ছাড়া এসব জলসীমায় প্রবেশ করা জাহাজকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময়ও এসব জাহাজকে সামুদ্রিক, বীমা ও অন্যান্য সেবা থেকে বঞ্চিত করার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
‘চোখের বদলে চোখ’
ইরানের কট্টরপন্থী রাজনৈতিক কর্মী আমির চিজারি আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত চিজারি বলেছেন, যেসব পারস্য উপসাগরীয় দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেসব দেশের বন্দর ব্যবহারেও বাধা দেওয়া উচিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘মাথার বদলে মাথা, চোখের বদলে চোখ’—এর অর্থ এসব বন্দর ইরানের মাধ্যমে অবরুদ্ধ করা।
নূর নিউজের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের নতুন কৌশলের গুরুত্ব শুধু আরেকটি নিষিদ্ধ জলসীমা তৈরিতে নয়; বরং অবরোধের বিরুদ্ধে সংঘাতের প্রচলিত কাঠামো বদলে দেওয়ার মধ্যেই এর আসল তাৎপর্য।
অর্থাৎ, কোনো জাহাজ দখল বা ধ্বংস করাই তেহরানের একমাত্র লক্ষ্য নয়। বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে কোনো জাহাজ বা বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার খরচ ও ঝুঁকি এত বেড়ে যায় যে সংশ্লিষ্ট পক্ষ আগেই পিছু হটে।
কূটনীতির পথ ক্রমেই সংকুচিত
এই সামরিক কৌশল জোরদার করার সময়ই কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মঙ্গলবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার পূর্বের প্রতিশ্রুতিতে ফিরে এলে এবং ইসলামাবাদ সমঝোতা পুনরুজ্জীবিত হলে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফেরার পথ তৈরি হতে পারে।
তবে ইরান সরকারের ঘনিষ্ঠ দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে Middle East Eye জানিয়েছে, পাকিস্তান ও কাতারের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে তেহরানকে জানানো হয়েছে—ওয়াশিংটন আগের সমঝোতায় ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহী নয়।
কূটনৈতিক পথ সংকুচিত হওয়ার অর্থ হলো, ইরানের জন্য সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় সমুদ্রপথই ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
তেহরানের হিসাব হলো—অবরোধের খরচ যদি শুধু ইরানকে না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকেও বহন করতে হয়, তাহলে একপর্যায়ে অবরোধ শিথিল করার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর চাপ তৈরি হবে।
ঝুঁকি কি শেষ পর্যন্ত ইরানেরই বেশি?
তবে ইরানের এই কৌশল যে বড় ধরনের ঝুঁকিমুক্ত, তা নয়। দেশটির ভেতরেই সমালোচকরা সতর্ক করছেন, দীর্ঘস্থায়ী সমুদ্রযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত ইরানের তেল রপ্তানি ও ট্যাংকার বহরকেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ইরানের সাবেক পার্লামেন্টারি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড ফরেন পলিসি কমিশনের চেয়ারম্যান হেশমতোল্লাহ ফালাহাতপিশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, দেশটির ট্যাংকার বহরকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এবং জাতীয় সম্পদ ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তবে কট্টরপন্থীদের যুক্তি ভিন্ন। তাদের মতে, ইরান যখন অস্তিত্বগত হুমকির মুখে, তখন শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব করে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। তাদের প্রশ্ন—এখন আপস করলেও ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালাবে না, তার নিশ্চয়তা কী?
তেলের বাজারে বাড়ছে চাপ
ইতোমধ্যে এই পাল্টাপাল্টি সংঘাতের প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল প্রবাহ যুদ্ধের আগের মাত্রার তুলনায় অনেক নিচে নেমে গেছে। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এ পথ দিয়ে চলাচল করত, সাম্প্রতিক সময়ে তা প্রায় ২ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত নেমেছে। একই সময়ে ব্রেন্টের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ পথ দিয়ে চলাচল করত। ফলে এই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বকে প্রভাবিত করবে না; বিশ্ববাজারে তেল, পরিবহন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ বাড়াবে।
সংঘাত কি হরমুজ ছাড়িয়ে যাবে?
ইরানের বর্তমান কৌশল মূলত একটি বড় জুয়া। তেহরান মনে করছে, সংঘাতের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক মূল্য যত বেশি ছড়িয়ে দেওয়া যাবে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবরোধ দীর্ঘদিন ধরে রাখা তত কঠিন হবে।
কিন্তু একই কৌশলের বিপরীত দিকও রয়েছে। হরমুজের বাইরে যত বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ, বন্দর ও আঞ্চলিক দেশ এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে, ততই ইরানের ওপর পাল্টা সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে পারে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল দীর্ঘদিন ব্যাহত হলে শুধু তেলের দাম নয়, বীমা ব্যয়, পণ্য পরিবহন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
ফলে তেহরানের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—অবরোধের খরচ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার এই কৌশল কি ওয়াশিংটনকে পিছু হটতে বাধ্য করবে, নাকি সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করে শেষ পর্যন্ত ইরানকেই বেশি অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষতির মুখে ফেলবে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে নিশ্চিত উত্তর নেই। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—হরমুজকে ঘিরে শুরু হওয়া সংঘাত এখন আর শুধু একটি প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই নয়; এটি ধীরে ধীরে পুরো উপসাগরীয় নৌ-বাণিজ্য ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার সংকটে পরিণত হচ্ছে।