নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইরানি অর্থ লেনদেন

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪২ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও প্রতিবছর শত শত কোটি ডলারের ইরানি অর্থ মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে। নতুন এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি কিছু ব্যাংকের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ইরানের অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঢুকতে পারছে। এসব বিদেশি ব্যাংকের মার্কিন ব্যাংকগুলোর সঙ্গে লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে।

এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ৯০০ কোটি ডলারের ইরানি অর্থ মার্কিন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় এসব অর্থের লেনদেন শনাক্ত করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ইরানের অর্থ বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ভুয়া কোম্পানি এবং মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠানো হতে পারে। এভাবে অর্থের মূল উৎস গোপন রেখে তা আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশ করানো সম্ভব হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এমন সময়ে এসব তথ্য সামনে এসেছে, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করেছে। ওয়াশিংটন সতর্ক করে বলেছে, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা কোনো কোম্পানি বা দেশকে মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যেও ইরান তার অর্থের প্রবাহ সচল রাখতে বিভিন্ন পথ ব্যবহার করছে। দেশটির আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস এখনো তেল। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি কমে গেলেও দেশটির বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ট্যাংকারে মজুত রয়েছে। এসব ট্যাংকারের অনেকগুলো এশিয়ার বিভিন্ন সমুদ্র এলাকায় অবস্থান করছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার কাছাকাছি সমুদ্র এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইরানি তেল মজুত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি চীনে যায়। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল কেপলারের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, আগস্টে চীন প্রতিদিন পাঁচ লাখ ব্যারেলের বেশি ইরানি তেল আমদানি করেছে। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান সমুদ্রের মধ্যেই এক ট্যাংকার থেকে অন্য ট্যাংকারে অপরিশোধিত তেল সরিয়ে দিতে পারে। এতে তেলের প্রকৃত উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কোনো ট্যাংকার থেকে তেল অন্য একটি জাহাজে নেওয়া হতে পারে। পরে সেই জাহাজ চীনে গিয়ে তেল সরবরাহ করতে পারে। সেখানে নথিপত্রে তেলটিকে ইরান ছাড়া অন্য কোনো উৎসের বলে দেখানো সম্ভব হতে পারে।

ভর্টেক্সার হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে এশিয়ার সমুদ্র এলাকায় ভাসমান মজুত হিসেবে প্রায় ৮ কোটি ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল রয়েছে। এসব তেলের মূল্য কয়েক শ কোটি ডলার হতে পারে।

চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতাও কমানোর চেষ্টা করছে ইরান। চীনা ক্রেতারা ইরানের তেলের দাম এখন অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে পরিশোধ করছে। ওই ইউয়ান ব্যবহার করে ইরান চীন থেকে বিভিন্ন পণ্য ও সেবা কিনতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে চীনা কোম্পানি ইরানে অবকাঠামো নির্মাণের কাজ করলে তেলের বিনিময়ে সেই কাজের মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে ইরানকে সরাসরি মার্কিন ডলারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক লেনদেন করতে হচ্ছে না। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার সুযোগও থাকছে।

অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে ক্রিপ্টোকারেন্সিও ব্যবহার করছে ইরান। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের উদ্ধৃত গবেষকদের মতে, বাণিজ্য, অস্ত্র এবং অন্যান্য পণ্য কেনার জন্য ইরান শত শত কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসও তেল বিক্রির অর্থ গ্রহণে ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে চীনা ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থও রয়েছে।

ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের ফলে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হয়। এতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা আরও কঠিন হতে পারে।

তবে পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর বিভিন্ন পথ তৈরি হলেও ইরানের জন্য মার্কিন ডলার ও অন্যান্য প্রধান মুদ্রার প্রয়োজন এখনো রয়েছে। আমদানি করা পণ্যের দাম পরিশোধ, সামরিক সরঞ্জাম কেনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্রদের সহায়তা দিতে এসব মুদ্রা প্রয়োজন হয়।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের উদ্ধৃত কর্মকর্তারা জানান, এ কারণে হংকং ও দুবাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্রে ইরান ভুয়া কোম্পানি ও মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। এসব কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান ইরানের তেল বিক্রির আয় এবং অন্যান্য রপ্তানি থেকে পাওয়া অর্থ ডলার, ইউরো ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিরহামে বদলে দিতে পারে। একই সঙ্গে এসব লেনদেনের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সম্পর্কও গোপন রাখা হতে পারে।

ইরানের অর্থ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ ঠেকাতে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় নিয়মিত বিভিন্ন ব্যাংক, কোম্পানি ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। তবে একটি ব্যাংক বা কোম্পানির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিলেই পুরো নেটওয়ার্ক বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

কারণ, ইরানের অর্থ স্থানান্তরের সঙ্গে জড়িত নেটওয়ার্কে একাধিক দেশ, ব্যাংক, কোম্পানি ও মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের অর্থ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশের পথ পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে তেল বিক্রি, বিকল্প মুদ্রায় লেনদেন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের মাধ্যমে ইরান তার অর্থপ্রবাহ চালু রাখার চেষ্টা করছে।

এএম
আরও পড়ুন