একসঙ্গে ১০ জাহাজে হামলা, ইরানের সমুদ্রযুদ্ধের নতুন কৌশল

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন আর শুধু আকাশ, স্থল কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন ময়দান হয়ে উঠেছে সমুদ্র। আর সেই সমুদ্রযুদ্ধে বড় ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে ইরান।

যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংসের পর তেহরান জানিয়েছে, তারা পাল্টা ১০টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্য ছিল আটটি তেলবাহী ট্যাংকার ও দুটি মার্কিন জাহাজ।

রয়টার্সের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর এটিই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলার ঢেউ। এরই মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নেমে এসেছে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অত্যন্ত নিচে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ইরান কি কেবল মার্কিন অবরোধের জবাব দিচ্ছে, নাকি সমুদ্রযুদ্ধকে নতুন কৌশলগত পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে?

কেন জাহাজকে লক্ষ্য করছে তেহরান?

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান চাপের অস্ত্র হলো অর্থনৈতিক অবরোধ। বিশেষ করে তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া ওয়াশিংটনের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

তেহরানের দৃষ্টিতে এর অর্থ হলো—শুধু সামরিক ঘাঁটি বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আঘাত করলে যথেষ্ট হবে না; বরং যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানকে চাপে রাখা হচ্ছে, সেটিকেও অস্থিতিশীল করতে হবে।

এ কারণেই সমুদ্রপথকে পাল্টা চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান।

তবে এখানে একটি বড় কৌশলগত পার্থক্য রয়েছে। ইরান যদি মার্কিন সামরিক জাহাজের পাশাপাশি বাণিজ্যিক জাহাজকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে, তাহলে এর প্রভাব শুধু ওয়াশিংটনের ওপর পড়বে না—বিশ্বের জ্বালানি বাজার, বীমা খাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

‘১০ জাহাজে হামলা’ আসলে কী বার্তা?

ইরানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর পরিমাণ ও বিস্তার।

একটি বা দুটি জাহাজে হামলা হলে সেটিকে বিচ্ছিন্ন প্রতিশোধ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেত। কিন্তু একসঙ্গে ১০টি জাহাজকে লক্ষ্য করার দাবি একটি ভিন্ন বার্তা দেয়—হরমুজ ও আশপাশের জলসীমায় কোনো জাহাজই পুরোপুরি নিরাপদ নয়।

রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান বলেছে তারা দুটি মার্কিন জাহাজ ও আটটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরানি হামলার জবাব হিসেবেই তারা পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করেছে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজ আক্রান্ত হওয়ার ইরানি দাবি ওয়াশিংটন অস্বীকার করেছে।

অর্থাৎ তথ্যযুদ্ধও এই সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কে কাকে কতটা আঘাত করেছে—তা নিয়েও দুই পক্ষের বক্তব্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।

হরমুজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি-দ্বার। যুদ্ধের আগে বিশ্বের দৈনিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে চলাচল করত। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজ এই সরু পথ অতিক্রম করত।

কিন্তু যুদ্ধ তীব্র হওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। কেপলারের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার মাত্র ছয়টি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে—১০ দিনের গড়ের তুলনায় যা অনেক কম। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করত।

এর অর্থ হলো, ইরান সরাসরি প্রণালিটি সম্পূর্ণ বন্ধ না করেও কার্যত ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা’তে পরিণত করতে পারছে।

এটাই সম্ভবত তেহরানের নতুন কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

পুরোপুরি বন্ধ নয়, ভয় তৈরি করাই কি লক্ষ্য?

হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া ইরানের জন্যও বিপজ্জনক। কারণ ইরান নিজেও উপসাগরীয় সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে চীনসহ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতারাও এই পথ ব্যবহার করে।

তাই সম্পূর্ণ অবরোধের পরিবর্তে ঝুঁকি তৈরি করা ইরানের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর কৌশল হতে পারে।

জাহাজ চলাচলে ভয় তৈরি হলে জাহাজ মালিকরা বিকল্প পথ খুঁজবে, বীমা খরচ বাড়বে, জাহাজের ভাড়া বাড়বে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ এড়িয়ে চলবে। অর্থাৎ একটি গুলি বা একটি ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি ক্ষতির চেয়েও বড় অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ঠিক সেটিই ঘটছে। হরমুজ দিয়ে তেল প্রবাহ যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক কমে গেছে এবং ব্রেন্টের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।

‘একটি জাহাজের বদলে পুরো নেটওয়ার্ক’

ইরানের কৌশলকে আরেকভাবে দেখা যায়। তেহরান শুধু হরমুজের কেন্দ্রস্থল নয়, উপসাগর ও ওমান উপসাগরের বিস্তৃত জলসীমায় ঝুঁকি তৈরি করতে চাইছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড আরও বড় একটি সমুদ্র ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ ঘোষণার ইঙ্গিত দিয়েছে। এর বিস্তার চাবাহার পর্যন্ত হতে পারে।

এর ফলে সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধি আরও বাড়তে পারে।

অর্থাৎ লক্ষ্য শুধু হরমুজের মুখে কয়েকটি জাহাজ থামানো নয়; বরং এমন একটি বিস্তৃত সামুদ্রিক ঝুঁকি তৈরি করা, যেখানে বাণিজ্যিক জাহাজকে প্রতিটি যাত্রার আগে নতুন করে হিসাব করতে হবে—এই পথ দিয়ে যাওয়া নিরাপদ কি না।

সমুদ্রযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে হুতি ফ্রন্ট

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হরমুজের পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবেও উত্তেজনা বাড়ছে।

ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর পাল্টা সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর হামলাও বেড়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সমুদ্রপথ—হরমুজ এবং বাব আল-মান্দাব—একই সময়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

এটি ইরানের জন্য একটি বড় কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। কারণ উপসাগরের একটি জলপথে চাপ তৈরি হলে জাহাজগুলো অন্য পথ ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু একই সময়ে একাধিক জলপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে বিকল্পের সুযোগ অনেক কমে যায়।

‘যুদ্ধের খরচ বাড়িয়ে দাও’

ইরানের সামুদ্রিক কৌশলের মূল দর্শন সম্ভবত এখানেই—যুদ্ধের অর্থনৈতিক খরচ শুধু ইরানকে বহন করতে হবে না; যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদেরও দিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করে, তাহলে ইরান পাল্টা এমন জায়গায় আঘাত করবে যেখানে সরাসরি মার্কিন সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারেও ধাক্কা লাগে।

এই কৌশল সফল হলে ওয়াশিংটনের জন্য একটি কঠিন সমীকরণ তৈরি হয়। একদিকে ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করতে হবে, অন্যদিকে সেই অবরোধ কার্যকর করতে গিয়ে যদি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বিপন্ন হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়বে।

ইতোমধ্যে তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ব্রেন্ট ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে এবং বাজারে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কিন্তু এই কৌশল ইরানের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ

তেহরানের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—সমুদ্রযুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া।

বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বাড়লে উপসাগরীয় দেশগুলো আরও সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়তে পারে। হরমুজে সামরিক এসকর্ট ব্যবস্থা জোরদার হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে একটি ভুল হামলা বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে।

আরেকটি সমস্যা হলো ইরানের নিজের অর্থনীতি। তেলের দাম বাড়লে তাত্ত্বিকভাবে ইরান লাভবান হতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের কারণে যদি দেশটির নিজস্ব তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যত আটকে যায়, তাহলে সেই সুবিধা খুব সীমিত হবে।

সামনে কী হতে পারে?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—ইরান কি হরমুজে আঘাতের মাত্রা আরও বাড়াবে?

ইরানের বিপ্লবী গার্ড ইতোমধ্যে আরও বড় সমুদ্র নিষিদ্ধ অঞ্চল তৈরির হুমকি দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে ‘একটি হামলা—একটি পাল্টা হামলা’ চক্রটি আরও ভয়ংকর হতে পারে।

যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে হরমুজ কেবল একটি সামরিক সংঘাতের কেন্দ্র থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট।

কারণ হরমুজে যুদ্ধ মানে শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের লড়াই নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তেল, গ্যাস, জাহাজ, বীমা, খাদ্যপণ্য, পরিবহন ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতি এবং কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন।

ইরানের নতুন সমুদ্রযুদ্ধের কৌশল তাই মূলত একটি বার্তাই দিচ্ছে—তেহরানকে যদি সমুদ্রপথে অর্থনৈতিকভাবে চেপে ধরা হয়, তাহলে সেই সমুদ্রই ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে বড় চাপের জায়গায় পরিণত হতে পারে।