বাব আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধের হুমকি, বড় যুদ্ধের আশঙ্কা ইয়েমেন দূতের

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বাব আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হান্স গ্রুন্ডবার্গ আগেই সতর্ক করে বলেছেন, কোনো পক্ষেরই এমন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়, যা ইয়েমেনকে আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতে টেনে নেয়। তাঁর সতর্কতার পেছনে রয়েছে ইয়েমেনে নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠা সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথকে ঘিরে হুথিদের হুমকি।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান-সমর্থিত হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরব এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর সংঘর্ষ তীব্র হয়েছে। হুথিরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের তেল ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় তেল স্থাপনায় আগুন লাগার পাশাপাশি বহু মানুষ আহত হয়েছেন।

এর ফলে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকা ইয়েমেন পরিস্থিতি আবার বড় সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে হুথিদের সামরিক তৎপরতা পশ্চিম ইয়েমেনের উপকূলীয় অঞ্চল এবং বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি এলাকায়ও বাড়ছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব?

বাব আল-মান্দাব হলো লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ। এ পথ দিয়েই এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়।

প্রণালিটি বন্ধ বা অনিরাপদ হয়ে পড়লে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হতে পারে। এতে সমুদ্রপথের দূরত্ব ও পরিবহন সময় বাড়বে, জ্বালানি ব্যয়ও বেড়ে যাবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতেও জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমেছে। ফলে বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যপথ একই সময়ে ঝুঁকির মুখে পড়লে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, হরমুজে জাহাজ চলাচল কমলেও বাব আল-মান্দাবে সাময়িকভাবে জাহাজ চলাচল বেড়েছিল।

হুথিদের নতুন হুমকি

হুথিরা দীর্ঘদিন ধরেই লোহিত সাগর ও এর আশপাশের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে তাদের সামরিক কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করেছে। বর্তমান আঞ্চলিক সংঘাত আরও তীব্র হলে বাব আল-মান্দাবকে লক্ষ্য করার আশঙ্কা নতুন করে সামনে এসেছে।

সাম্প্রতিক সংঘর্ষে হুথিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী ইয়েমেনে বিমান হামলা চালিয়েছে। একটি কারাগারে বিমান হামলায় অন্তত ২৩ জন নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে হুথিরা শুধু স্থলভাগে সৌদি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তাও তখন সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

হরমুজের পর আরেক সংকট?

বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—একটির পর একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর ঝুঁকিতে পড়ছে।

হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনার কারণে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অন্যদিকে ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সংঘর্ষ নতুন করে তীব্র হয়েছে। ফলে পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত একটি দীর্ঘ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নয়, এশিয়া ও ইউরোপের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব পড়ে জ্বালানি, খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং ভোক্তা পণ্যের দামে।

ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি বা তার ওপরে উঠে গেছে। হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দাবেও যদি বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়, তাহলে বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।

ইয়েমেন আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে কি না।

২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনে সহিংসতা তুলনামূলকভাবে কমেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহের সংঘর্ষে পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। পশ্চিম উপকূল ও তায়েজ অঞ্চলে লড়াই বেড়েছে এবং হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

সৌদি আরবও নতুন করে সরাসরি সামরিক চাপে পড়ছে। দেশটির তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হুথি হামলা রিয়াদের জন্য বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী হুথিদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের দিকে পাল্টা অভিযান চালাচ্ছে।

এই সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে শুধু ইয়েমেন নয়, পুরো লোহিত সাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।

বাংলাদেশের জন্যও ঝুঁকি

বাব আল-মান্দাব সংকট বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইউরোপমুখী বাংলাদেশের পণ্যবাহী জাহাজ এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের একটি অংশ লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালভিত্তিক সমুদ্রপথের সঙ্গে যুক্ত।

বাব আল-মান্দাব অনিরাপদ হয়ে পড়লে জাহাজগুলোকে দীর্ঘতর বিকল্প পথে যেতে হতে পারে। এতে পরিবহন সময় ও ভাড়া বাড়বে। পোশাকশিল্পের কাঁচামাল আমদানি এবং তৈরি পোশাক রপ্তানিতেও অতিরিক্ত লজিস্টিক ব্যয় তৈরি হতে পারে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব উভয় প্রণালিতে একই সময়ে অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর দ্বিমুখী চাপ পড়বে।

অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক সংঘাত তখন আর শুধু আঞ্চলিক থাকবে না; এর অভিঘাত পৌঁছাতে পারে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতেও।

সামনে কী?

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের সংকটকে আর শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হরমুজ, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত অঞ্চল এখন একই বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

হুথিরা যদি বাব আল-মান্দাবের ওপর কার্যকর অবরোধ বা ব্যাপক হামলা শুরু করে, তাহলে বিশ্ব বাণিজ্য নতুন করে বড় ধাক্কা খেতে পারে। আর সৌদি আরব ও তার মিত্ররা যদি আরও বড় সামরিক অভিযানে যায়, তাহলে ইয়েমেনের যুদ্ধ আবার বহু বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতে ফিরে যেতে পারে।

এই কারণেই ইয়েমেনের জাতিসংঘ দূতের সতর্কবার্তা গুরুত্বপূর্ণ—একটি সংঘাতকে আরেকটি সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত করে দিলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট তৈরি হতে পারে। আর বাব আল-মান্দাব সেই নতুন ফ্রন্টের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাগুলোর একটি।