মলদোভা থেকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে বহনকারী বিমানের জন্য ড্রোন কোনো বাস্তব হুমকি তৈরি করেনি বলে দাবি করেছে ক্রেমলিন। বৃহস্পতিবার মস্কোয় এক সংবাদ সম্মেলনে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এ কথা বলেন।
জেলেনস্কির বিমান মলদোভার রাজধানী চিসিনাউ বিমানবন্দরে অবস্থানের সময় একটি ড্রোন থেকে সম্ভাব্য হুমকি তৈরির খবর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পেসকভ তা নাকচ করে দেন। তাঁর ভাষায়, কথিত এই হুমকি ছিল ‘ক্ষণস্থায়ী’ এবং বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্বই ছিল না। ইউক্রেনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
পেসকভ বলেন, জেলেনস্কির উড়োজাহাজকে ঘিরে যে ‘সাময়িক হুমকি’র কথা বলা হচ্ছে, সেটি আদৌ ছিল না এবং ইউক্রেনীয়রাই বিষয়টি ইতোমধ্যে স্বীকার করেছে।
এর পাশাপাশি মলদোভা সীমান্তে ড্রোন ও বিস্ফোরক বহনকারী এক ইউক্রেনীয় নাগরিককে আটকের খবর নিয়েও মন্তব্য করেন ক্রেমলিনের এই মুখপাত্র। ঘটনাটিকে তিনি ইউক্রেনের সাজানো একটি ‘উসকানি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমা দেশগুলোকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত করতেই এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
ব্রিটিশ কূটনীতিকদের তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ
রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস—এফএসবি এক সাবেক ব্রিটিশ দূতাবাসকর্মীকে আটকের যে তথ্য দিয়েছে, সে বিষয়েও কথা বলেন পেসকভ। রুশ নিরাপত্তা সংস্থার দাবি, ওই ব্যক্তি ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউর হয়ে কাজ করছিলেন এবং ব্রিটিশ কূটনীতিকদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন।
পেসকভের মতে, এ ঘটনা ইউক্রেনের ওপর ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি স্পষ্ট করে। তিনি এর সঙ্গে নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইন বিস্ফোরণের প্রসঙ্গও টানেন। তাঁর দাবি, জার্মানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ইউরোপের রাজধানীগুলোর জন্য এ ধরনের ঘটনাকে গুরুতর উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কৃষ্ণসাগরে হামলা নিয়ে পুতিনের সঙ্গে সামরিক বৈঠক
এদিকে কৃষ্ণসাগর উপকূলীয় রুশ শহরগুলোতে ইউক্রেনের হামলার তীব্রতা বাড়ায় তা মোকাবিলায় সামরিক বাহিনীর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিয়মিত আলোচনা করছেন বলে জানান পেসকভ।
তিনি বলেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার চলমান সামরিক অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসব বিষয়সহ অন্যান্য পরিস্থিতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট প্রতিদিন সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
কৃষ্ণসাগরে জাহাজে হামলার কারণে রাশিয়া-তুরস্ক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পেসকভ বলেন, এমন আশঙ্কা নেই। তাঁর দাবি, এসব হামলা রাশিয়া শুরু করেনি।
রুশ প্রেসিডেন্টের বক্তব্য উদ্ধৃত করে পেসকভ বলেন, রাশিয়া এসব হামলা চালায়নি। বরং ইউক্রেন রাশিয়ার বেসামরিক অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলা শুরু করার পরই পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
এর আগে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ জানিয়েছিলেন, কৃষ্ণসাগরে জাহাজে হামলার বিষয়ে একটি সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা মোরাটোরিয়াম প্রস্তাব করতে ইউক্রেন তুরস্ককে অনুরোধ করেছে। তবে এটি বাস্তবে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
লাভরভের দাবি, বিপুলসংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজ ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনীর জন্য অস্ত্র, গোলাবারুদ ও জ্বালানি পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।
আবুধাবিতে শান্তি আলোচনা নিয়ে আগ্রহ
রাশিয়া-ইউক্রেন শান্তি আলোচনা আয়োজনের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রস্তুতির কথাও তুলে ধরেন পেসকভ। তাঁর বক্তব্য, ইউক্রেন ইস্যুতে আলোচনার আয়োজক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আগ্রহ আবুধাবি একাধিকবার প্রকাশ করেছে এবং মস্কো এ অবস্থানকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
পেসকভ বলেন, আবুধাবির বন্ধুরা বারবার তাদের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও আলোচনার জন্য নিজেদের মধ্যস্থতা ও আয়োজক হিসেবে প্রস্তাব দিতে প্রস্তুত। রাশিয়া এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাশিয়া-বেলারুশের শস্যে শুল্ক নিয়ে লাটভিয়াকে সতর্কতা
এদিকে রাশিয়া ও বেলারুশ থেকে আমদানি করা শস্যের ওপর শুল্ক আরোপের লাটভিয়ার পরিকল্পনার সমালোচনা করেছে ক্রেমলিন।
পেসকভের দাবি, এ সিদ্ধান্তের কারণে লাটভিয়াই বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়বে। তাঁর মতে, বৈশ্বিক বাজার অনেক বড় এবং লাটভিয়ার বাইরেও রাশিয়া ও বেলারুশের শস্যের জন্য বিকল্প বাজার রয়েছে।
তিনি বলেন, বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে লাটভিয়ার নেওয়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশটির জনগণের জন্যও ক্ষতির কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ অব্যাহত রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন পেসকভ। তাঁর মতে, শুল্ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদেশি নীতির প্রভাবও এসব সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করছে।
সব মিলিয়ে পেসকভের বক্তব্যে ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে রাশিয়া-মলদোভা, রাশিয়া-ব্রিটেন ও রাশিয়া-তুরস্ক সম্পর্কের বিভিন্ন টানাপোড়েন উঠে এসেছে। একই সঙ্গে শান্তি আলোচনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্ভাব্য ভূমিকার প্রতিও মস্কোর ইতিবাচক অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন ক্রেমলিনের এই মুখপাত্র।