ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে তেহরানের বিরোধ যখন আরও তীব্র হচ্ছে, তখন ইরানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে রাশিয়া ও চীন। পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু পরিদর্শকদের প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার দিচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিচালনা পর্ষদ বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ইরানকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নজরে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রায় দুই দশকের মধ্যে এই প্রথম এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলো। ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের তদন্তে সহযোগিতা না করা এবং অঘোষিত স্থাপনায় পাওয়া ইউরেনিয়ামের চিহ্ন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
৩৫ সদস্যের আইএইএ বোর্ডে প্রস্তাবটির পক্ষে ২৩টি দেশ ভোট দেয়। বিপরীতে রাশিয়া, চীন ও নাইজার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে এবং আটটি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।
পশ্চিমা দেশগুলোর দাবি, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শন জরুরি। তাদের আশঙ্কা, ইউরেনিয়াম-সংক্রান্ত তথ্য ও স্থাপনাগুলোতে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে।
তবে তেহরান এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের বক্তব্য, তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পরমাণু স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আইএইএর সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও সমালোচনা করেছে ইরান।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি সতর্ক করে বলেছেন, আইএইএর এমন পদক্ষেপ উল্টো আরও কিছু দেশকে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চিন্তা করতে উৎসাহিত করতে পারে।
এদিকে রাশিয়া ও চীনের অবস্থান ইরানের জন্য কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে দুই দেশই ভেটো ক্ষমতার অধিকারী। ফলে আইএইএর সুপারিশের পর নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে মস্কো ও বেইজিংয়ের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ইরানকে ঘিরে এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন এমন সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের সামরিক সংঘাত ও অর্থনৈতিক চাপও অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে ইরানের তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও চাপ বেড়েছে। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক এই পরিস্থিতিতে তেহরানের জন্য বিকল্প অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক পথ ধরে রাখার সুযোগ তৈরি করছে।
বিশেষ করে চীন ইরানের তেল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান চীনের সঙ্গে তেল বিনিময়ভিত্তিক একটি ব্যবস্থা ব্যবহার করছে, যার মাধ্যমে চীনা পণ্য আমদানির বিপরীতে ইরানি তেলের রাজস্ব ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ফলে ইরানের পরমাণু ইস্যু এখন শুধু পরিদর্শন বা ইউরেনিয়াম মজুতের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা, তেল বাণিজ্য এবং রাশিয়া-চীনের ভূরাজনৈতিক অবস্থান। পশ্চিমা চাপ যত বাড়ছে, ততই ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক শক্তির বিভাজনও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।