সরকারি ব্যয় কমানোর চাপ আইএমএফের

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৮ এএম

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির আওতাভুক্ত দেশগুলোতে সরকারি ব্যয় কমানোর চাপ গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফাম। সংস্থাটির দাবি, অতিরিক্ত কৃচ্ছ্রসাধনের ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারি সেবা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এতে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে অক্সফাম জানায়, আইএমএফের বর্তমান ঋণ কর্মসূচিগুলোতে সামাজিক খাতের সুরক্ষাব্যবস্থাও আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাদের আশঙ্কা, এভাবে ব্যয় সংকোচন অব্যাহত থাকলে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

অক্সফামের হিসাব অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আইএমএফের ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর জন্য নির্ধারিত কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যম বার্ষিক মাত্রা ছিল জিডিপির শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সেই হার চারগুণের বেশি বেড়ে জিডিপির শূন্য দশমিক ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

এই প্রবণতাকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে অক্সফাম বলছে, আইএমএফ হয়তো ১৯৮০-এর দশকে প্রচলিত কঠোর ‘কাঠামোগত সমন্বয়’ বা স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট কর্মসূচির দিকে আবারও ঝুঁকছে। ওই সময় দেশগুলোকে ধাপে ধাপে নয়, বরং কর্মসূচির শুরুতেই বড় ধরনের সরকারি ব্যয় কমাতে চাপ দেওয়া হতো।

অক্সফামের আন্তর্জাতিক জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা নাবিল আবদো এ ধরনের নীতির সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, শুরুতেই বড় মাত্রায় কৃচ্ছ্রসাধনের চাপ দেওয়া এমন, যেন একটি দেশকে একবারে পুরো বোতল বিষ পান করতে বলা হচ্ছে।

তবে অক্সফামের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে আইএমএফ। সংস্থাটির মুখপাত্র জুলি কোজাক বলেন, আইএমএফের প্রতিটি ঋণ কর্মসূচিতেই ‘সামাজিক ব্যয়ের সীমা’ বা ‘সোশ্যাল স্পেন্ডিং ফ্লোর’ রাখা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো ঝুঁকিপূর্ণ ও অসহায় মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক ব্যয় সুরক্ষিত রাখা।

জুলি কোজাক আরও জানান, আইএমএফ শুধু সরকারি ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে না। বরং ঋণগ্রহীতা দেশগুলো কীভাবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব ও কর আদায় বাড়াতে পারে, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আইএমএফের ব্যয় সংকোচন নিয়ে এই বৈশ্বিক বিতর্ক বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের ঋণ সহায়তা ও অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দেশে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম চলছে।

আইএমএফের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় অপ্রয়োজনীয় মূলধনি ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অগ্রাধিকারমূলক সামাজিক ব্যয়ের আওতায় সুরক্ষিত রাখার কথাও বলা হয়েছে।

চলতি ২০২৬ সালেও বাংলাদেশে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি সীমিত সম্পদের মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় অব্যাহত রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে আইএমএফের ঋণ ও সংস্কার কর্মসূচির শর্ত পূরণ করতে গিয়ে সরকারি কৃচ্ছ্রসাধনের মাত্রা কতটা হবে এবং এর প্রভাবে সাধারণ মানুষের মৌলিক সেবা ও অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে—অক্সফামের উত্থাপিত এই প্রশ্ন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এমইউ
আরও পড়ুন