পরমাণু ইস্যুতে আইএইএ’র অভিযোগ প্রত্যাখ্যান ইরানের

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিচালনা পর্ষদের গৃহীত প্রস্তাবকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। একই সঙ্গে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধে নিজেদের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পালনে ইরান ব্যর্থ হয়েছে-আইএইএর এমন অভিযোগকে ‘রাজনৈতিক’ ও ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছে দেশটি।

জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত গোলামহোসেইন দারজি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলেন, ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, সেগুলো কারিগরি বা প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; বরং এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ এ তথ্য জানিয়েছে।

এর আগে আইএইএর পরিচালনা পর্ষদ ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি’র অধীনে থাকা বাধ্যবাধকতা পালনে ‘অব্যাহত ব্যর্থতার’ অভিযোগে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েকটি প্রধান মিত্র দেশ প্রস্তাবটির পক্ষে অবস্থান নেয়।

প্রস্তাবে ইরানের পরমাণু কার্যক্রম নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ইরানের রাষ্ট্রদূত দারজি বলেন, বৈঠকে কয়েকটি দেশ ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি সম্পর্কে যে ‘ভিত্তিহীন অভিযোগ ও বিকৃত তথ্য’ উপস্থাপন করেছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান তা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।

দুই দশক পর আইএইএ'র কঠোর পদক্ষেপ

ইরানকে নিয়ে আইএইএর এই সিদ্ধান্তের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ প্রায় ২০ বছর পর এই প্রথম সংস্থাটির পরিচালনা পর্ষদ ইরানের বিরুদ্ধে এ ধরনের একটি প্রস্তাব গ্রহণ করল।

পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটির স্বাক্ষরকারী দেশ ইরান। চুক্তি অনুযায়ী, পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে দেশটিকে বিরত থাকতে হয়। পাশাপাশি আইএইএর নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় দেশটির পরমাণু উপকরণ ও কার্যক্রম পরিদর্শন ও যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এর উদ্দেশ্য হলো-কোনো দেশ পরমাণু প্রযুক্তি বা উপকরণ সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে কি না, তা নিশ্চিত করা।

ইরান অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচির লক্ষ্য শান্তিপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণাসহ বেসামরিক প্রয়োজনে পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার তাদের রয়েছে বলে দাবি করে তেহরান।

রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ

আইএইএর সর্বশেষ সিদ্ধান্তের পর ইরান আবারও অভিযোগ করেছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা দেশগুলো রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।

তেহরানের বক্তব্য অনুযায়ী, পরমাণু কর্মসূচির প্রকৃতি নির্ধারণে রাজনৈতিক অভিযোগের পরিবর্তে প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ইরানের রাষ্ট্রদূতও নিরাপত্তা পরিষদকে দেওয়া চিঠিতে একই অবস্থান তুলে ধরেছেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের অবস্থান হলো, ইরানের পরমাণু কার্যক্রমের বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও যাচাইব্যবস্থা কার্যকর রাখা জরুরি। বিশেষ করে এনপিটির অধীনে ইরানের প্রতিশ্রুতি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আইএইএর সহযোগিতা প্রয়োজন।

নিরাপত্তা পরিষদে এখন কী হবে?

আইএইএর পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের পর বিষয়টি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যাওয়ায় ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়তে পারে। তবে নিরাপত্তা পরিষদে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে ইরান যদি আইএইএর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আগের অবস্থানেই থাকে, তাহলে তেহরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে ইরান বলছে, শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তার কোনো বাস্তব ও কারিগরি ভিত্তি নেই। তেহরানের দাবি, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের সমাধান হওয়া উচিত রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে নয়, বরং নিরপেক্ষ প্রযুক্তিগত যাচাই ও আলোচনার মাধ্যমে।

আইএইএর প্রস্তাবের পর ইরানের এই কঠোর প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট-পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তেহরান ও পশ্চিমা বিশ্বের বিরোধ আবারও আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে।