তেলাপোকার ‘দুধ’ কতটা পুষ্টিকর!

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৩ এএম

তেলাপোকার ‘দুধ’ কতটা পুষ্টিকর, নাক কীভাবে সঠিকভাবে ঝাড়তে হয় কিংবা সাপের শরীরের কোন জায়গায় চাপ দিলে কামড়ানোর সম্ভাবনা বেশি-এমন অদ্ভুত শোনানো গবেষণাই এবার পেয়েছে বিশ্বখ্যাত ইগ নোবেল পুরস্কার।

প্রতি বছর এমন বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়, যা প্রথমে মানুষকে হাসায়, পরে ভাবতে বাধ্য করে। ২০২৬ সালের ইগ নোবেল পুরস্কারে প্রাণিবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা, পদার্থবিজ্ঞান, প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী গবেষণাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এবারের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে।

তেলাপোকার ‘দুধ’ কেন এত আলোচিত?

রসায়ন বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন সেই গবেষকরা, যারা Pacific beetle cockroach বা Diploptera punctata প্রজাতির তেলাপোকার দুধসদৃশ তরল নিয়ে গবেষণা করেছেন।

সাধারণ তেলাপোকার মতো এই প্রজাতিটি ডিম পাড়ার বদলে জীবন্ত বাচ্চা জন্ম দেয়। মায়ের শরীর থেকে উৎপন্ন দুধসদৃশ পদার্থ বাচ্চাদের পুষ্টি জোগায়। গবেষকরা দেখতে পান, এই তরল বাচ্চাদের শরীরের ভেতরে ক্ষুদ্র স্ফটিকের আকারে জমা হয়। এসব স্ফটিকে প্রোটিন, চর্বি ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান অত্যন্ত ঘনভাবে সঞ্চিত থাকে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বাজারে তেলাপোকার দুধ বোতলজাত করে বিক্রি করার প্রস্তুতি চলছে। বরং গবেষণাটি দেখিয়েছে, প্রকৃতিতে প্রাণীরা কীভাবে অল্প জায়গায় বিপুল পরিমাণ শক্তি ও পুষ্টি সংরক্ষণ করতে পারে।

নাক ঝাড়ারও আছে বিজ্ঞান!

চিকিৎসা বিভাগে মরণোত্তর পুরস্কার পেয়েছেন জাপানি বিজ্ঞানী উন্নো তোকুজি। বহু বছর আগে তিনি মানুষের নাক ঝাড়ার প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করেছিলেন।

গবেষণায় নাক দিয়ে বাতাস চলাচলের গতি, চাপ এবং কানের ওপর এর প্রভাবসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণার ফল অনুযায়ী, নাকের একটি অংশ বেশি বন্ধ থাকলে একসঙ্গে দুই নাসারন্ধ্র দিয়ে জোরে বাতাস বের করার পরিবর্তে এক পাশ করে নাক পরিষ্কার করা তুলনামূলকভাবে উপযোগী।

দৈনন্দিন জীবনের অত্যন্ত সাধারণ একটি কাজকে এত বিস্তারিতভাবে বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করাই গবেষণাটিকে ইগ নোবেলের উপযুক্ত করে তুলেছে।

সাপ কখন কামড়ায়?

জীববিজ্ঞান বিভাগে পুরস্কার পাওয়া গবেষণাটিও কম অদ্ভুত নয়। গবেষকরা জানতে চেয়েছিলেন, বিষধর সাপের শরীরের কোন অংশে চাপ পড়লে তার কামড়ানোর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি হয়।

গবেষণায় দক্ষিণ আমেরিকার বিষধর Bothrops jararaca সাপের শরীরের বিভিন্ন অংশে নিয়ন্ত্রিতভাবে চাপ প্রয়োগ করে প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়। মাথায় চাপ পড়লে কামড়ানোর সম্ভাবনা ছিল প্রায় ৪৪ শতাংশ। শরীরের মাঝামাঝি অংশে চাপ দিলে তা নেমে আসে প্রায় ২০ শতাংশে।

গবেষণাটি মূলত সাপের আত্মরক্ষামূলক আচরণ বোঝার চেষ্টা। তবে স্বাভাবিকভাবেই এমন পরীক্ষা বাস্তবে অনুসরণ করার মতো কোনো পরামর্শ নয়।

মশার শরীর দিয়ে 3D প্রিন্টার!

প্রযুক্তি বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে মৃত মশার মুখের সূচালো অংশ নিয়ে করা গবেষণা। মশার proboscis রক্ত শোষণের জন্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম নল হিসেবে কাজ করে। গবেষকরা দেখিয়েছেন, এই প্রাকৃতিক কাঠামো অত্যন্ত সূক্ষ্ম 3D প্রিন্টিং নোজলের ধারণা দিতে পারে।

অর্থাৎ প্রকৃতির কোটি কোটি বছরের বিবর্তন এমন একটি ক্ষুদ্র কাঠামো তৈরি করেছে, যা আধুনিক প্রযুক্তির জন্যও অনুপ্রেরণা হতে পারে।

আরও অদ্ভুত গবেষণার স্বীকৃতি

এবারের ইগ নোবেলে এমন আরও কিছু গবেষণা পুরস্কৃত হয়েছে, যেগুলোর বিষয় শুনলে প্রথমে হাসি আসতে পারে। যেমন-কোন কোণে প্রস্রাব করলে পাবলিক ইউরিনালে ছিটা কম হবে, বাবা-মায়ের কাছে ছোট শিশুদের শরীরের গন্ধ কেন কিশোরদের তুলনায় বেশি ভালো লাগে, কিংবা পুরোনো অন্তর্বাস মাটির স্বাস্থ্য বোঝার সূচক হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না-এসব নিয়েও গবেষণা হয়েছে।

মাটিবিজ্ঞান গবেষণায় প্রায় এক হাজার মানুষকে তুলার অন্তর্বাস মাটিতে পুঁতে রাখতে বলা হয়েছিল। পরে কাপড় কতটা পচেছে তা দেখে মাটিতে জৈবিক কার্যক্রমের মাত্রা বোঝার চেষ্টা করা হয়। গবেষণাটি দেখায়, মাটির অণুজীব যত বেশি সক্রিয়, কাপড়ের তন্তু তত দ্রুত ভাঙতে পারে।

হাসির আড়ালে গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞান

ইগ নোবেল পুরস্কারের বিশেষত্ব এখানেই। গবেষণাগুলো অনেক সময় হাস্যকর বা অদ্ভুত মনে হলেও এর পেছনে থাকে বাস্তব বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন। কোনো গবেষণা মানুষের আচরণ বোঝাতে সাহায্য করতে পারে, কোনোটি চিকিৎসা বা প্রযুক্তিতে নতুন ধারণা দিতে পারে, আবার কোনোটি প্রকৃতির অজানা কৌশল সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।

তেলাপোকার দুধের গবেষণা যেমন দেখাচ্ছে, প্রকৃতিতে পুষ্টি সংরক্ষণের অসাধারণ কৌশল রয়েছে। মশার মুখের গঠন প্রযুক্তিবিদদের নতুন ধরনের ক্ষুদ্র নোজল তৈরির ধারণা দিতে পারে। আর নাক ঝাড়ার মতো সাধারণ একটি কাজও মানুষের শরীরের ওপর কী ধরনের চাপ সৃষ্টি করে, সে সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে।

তাই ইগ নোবেলের মূল বার্তা শুধু হাস্যরস নয়-বিজ্ঞানের প্রশ্নের কোনো বিষয়ই খুব ছোট, সাধারণ বা অদ্ভুত নয়। অনেক সময় সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন থেকেই নতুন জ্ঞান ও নতুন ধারণার জন্ম হয়।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন