হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলার পর ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি

দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর অবস্থানে ইসরায়েলি হামলার পর ইরানের কট্টরপন্থী রাজনীতিকদের মধ্যে সামরিকভাবে আরও কঠোর জবাব দেওয়ার দাবি জোরালো হয়েছে। তাদের কেউ কেউ তেহরানের সংযত অবস্থান পরিত্যাগ করে সরাসরি সামরিক মোকাবিলার মাধ্যমে নিজেদের ‘প্রতিরোধ ক্ষমতা’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর একটি বড় ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংস করেছে। গত দুই বছরে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়া ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্র হিজবুল্লাহর ওপর নতুন এই হামলা তেহরানের ওপরও রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে।

ইরানের অতি রক্ষণশীল সংসদ সদস্য মোহাম্মদ-তাগি নাকদ-আলি এ পরিস্থিতির জন্য তেহরানের কথিত ‘অসংঘাতমূলক অবস্থানকে’ দায়ী করেছেন। তার অভিযোগ, ইসরায়েলের হুমকির জবাবে ইরান যথেষ্ট কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ায় দক্ষিণ লেবানন ও হিজবুল্লাহ এখন গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

তিনি বলেন, ইরানের ‘আগাম হামলা’ চালানো উচিত।

নাকদ-আলির বক্তব্য ইরানের রাজনীতি ও গণমাধ্যমে চলমান বৃহত্তর বিতর্কেরই প্রতিফলন। প্রশ্ন উঠছে—সংযত অবস্থান কি আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমায়, নাকি এতে ইরানের প্রতিপক্ষরা আরও আগ্রাসী হওয়ার সুযোগ পায়?

এই বিতর্ক শুধু হিজবুল্লাহ বা আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাত এবং দেশটির পরমাণু নীতিও ক্রমশ জড়িয়ে পড়ছে।

ইরানি পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির মুখপাত্র হাসান গাশঘাভিও বৃহস্পতিবার কঠোর অবস্থানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তার ভাষ্য, ইরান ‘সম্পূর্ণ ও সর্বাত্মক প্রতিরোধ সক্ষমতা’ অর্জন না করা পর্যন্ত যেকোনো মুহূর্তে হামলার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

একই ধরনের যুক্তি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ঘিরেও সামনে এসেছে। কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা ও বিশ্লেষকদের কেউ কেউ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিত করার এমনকি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন।

‘ময়দান’ বনাম কূটনীতি

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এ বিতর্ক নতুন নয়। দেশটির রাজনৈতিক পরিসরে ‘ময়দান’ শব্দটি সামরিক শক্তি ও আঞ্চলিক সশস্ত্র নেটওয়ার্ককে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এর বিপরীতে রয়েছে কূটনৈতিক সমাধানের পথ।

হাসান রুহানির প্রেসিডেন্ট থাকার সময় এই বিভাজন বিশেষভাবে প্রকাশ্যে এসেছিল। সে সময় তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ জারিফ প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছিলেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর সামরিক অগ্রাধিকার প্রাধান্য পাচ্ছে।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সরকার ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেনি। তবে সামরিক কৌশল নিয়ে সবচেয়ে তীব্র মতপার্থক্য এখন অনেকাংশে দেশটির রক্ষণশীল রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরেই দেখা যাচ্ছে।

মূল প্রশ্নটি হলো—কূটনীতির পাশাপাশি সংযম বজায় রাখলে ইরান বেশি নিরাপদ থাকবে, নাকি প্রতিপক্ষকে বোঝাতে হবে যে তেহরান প্রয়োজনে সংঘাত আরও বাড়াতে প্রস্তুত?

যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের দুর্বল হয়ে পড়ার মতো একাধিক চাপ একসঙ্গে মোকাবিলা করতে গিয়ে ইরানের জন্য এই বিতর্ক এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

হুথিদের উদাহরণ

হিজবুল্লাহর তুলনায় ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে হিজবুল্লাহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়লেও হুথিরা সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এমনকি সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বাব আল-মান্দাব প্রণালীর আশপাশে তারা নতুন ভূখণ্ডও দখল করেছে।

কট্টরপন্থীদের যুক্তিতে, এর মাধ্যমে দেখানো যায়—কোনো মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী সামরিক চাপের মুখেও পিছু না হটে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে পারে।

তবে একই উদাহরণ তেহরানের জন্য ঝুঁকিও স্পষ্ট করে। জাহাজ চলাচলের ওপর হুথিদের হামলার সঙ্গে ইরানের সম্পৃক্ততা আরও দৃশ্যমান হলে যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ইরানের সংঘাত আরও গভীর হতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন তেহরান নিজেই সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে কঠিন চাপের মধ্যে রয়েছে।

এ কারণেই ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে বিতর্কটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

কট্টরপন্থীদের দীর্ঘদিনের ধারণা, হিজবুল্লাহসহ মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইরানের জন্য একটি বহিরাগত প্রতিরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করে। এর মাধ্যমে ইরানের ভূখণ্ডে হুমকি পৌঁছানোর আগেই প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা বা প্রতিহত করা সম্ভব। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মিত্র গোষ্ঠীগুলো দুর্বল হয়ে পড়লে পিছু হটার প্রয়োজন নেই; বরং তাদের প্রতিরোধ সক্ষমতা পুনর্গঠন আরও জরুরি।

অন্যদিকে বিপরীত মত হলো, ইরানের নিজস্ব অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি বিবেচনায় তেহরানের আরও সতর্ক ও সংযত নীতি গ্রহণ করা উচিত।

হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের নতুন হামলা এবং একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সংঘাত—এই দুই বাস্তবতা কট্টরপন্থী ও সংযমপন্থীদের বিতর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এখন তেহরান কোন পথ বেছে নেয়, তার ওপর শুধু ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের ভবিষ্যৎ নয়, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের পরিধিও অনেকাংশে নির্ভর করতে পারে।