পেজেশকিয়ানকে সরানো নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্যে

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানকে ক্ষমতা থেকে সরানোর একটি উদ্যোগ দেশটির রক্ষণশীল রাজনৈতিক শিবিরের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। বিষয়টি কট্টরপন্থী ও মধ্যপন্থীদের দ্বন্দ্বের চেয়ে বরং রক্ষণশীলদের নিজেদের মধ্যকার ক্ষমতার লড়াইকেই বেশি স্পষ্ট করছে। যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এই বিভাজন আরও তীব্র হয়েছে বলে ইরানভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার আইনপ্রণেতাদের একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে এক কট্টরপন্থী এমপি পেজেশকিয়ানের ‘রাজনৈতিক অযোগ্যতা’ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ইরানের সংবিধানের ৮৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এমন উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টকে অপসারণের প্রক্রিয়ায় গড়াতে পারে।

ওই আইনপ্রণেতা পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ইরানের প্রথম প্রেসিডেন্ট আবোলহাসান বানিসাদরের তুলনাও করেন। ১৯৮১ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরুর এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বানিসাদরকে সংসদের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পেজেশকিয়ানকে অপসারণের উদ্যোগ সফল করার মতো প্রয়োজনীয় সংসদীয় সমর্থন রয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ এখনো নেই।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রভাবশালী রক্ষণশীল নেতা মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন। গালিবাফের ঘনিষ্ঠ আইনপ্রণেতা মোজতবা জারেই পরে ঘটনাটিকে সরকারের বিরুদ্ধে একটি ‘অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি দাবি করেন, পেজেশকিয়ানের সরকার সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সমর্থনপুষ্ট।

জারেই আরও সতর্ক করে বলেছেন, এমন প্রচেষ্টা ও হুমকি অব্যাহত থাকলে তিনি এর সঙ্গে জড়িত আইনপ্রণেতা ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পরিচয় প্রকাশ করতে পারেন।

গালিবাফ বনাম কট্টরপন্থীরা

এই বিরোধের পেছনে রক্ষণশীল শিবিরের ভেতরের দীর্ঘদিনের ক্ষমতার দ্বন্দ্বও রয়েছে। গালিবাফ নিজে একজন রক্ষণশীল নেতা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তিনি সাঈদ জলিলি-ঘনিষ্ঠ কট্টরপন্থী গোষ্ঠী, পায়দারি ও শারিয়ানপন্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে সংঘাতে জড়িয়েছেন।

পেজেশকিয়ানকে সরানোর উদ্যোগের পেছনে থাকা আইনপ্রণেতা শারিয়ান বা ‘স্ট্র্যাটেজিক নেটওয়ার্ক অব ইসলামিক রেভল্যুশন সাপোর্টার্স’-এর সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেছেন জারেই ও কয়েকজন আইনপ্রণেতা। ২০২৪ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে গঠিত এই জোটের সঙ্গে পায়দারি পার্টি এবং জলিলির রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।

এই গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিরোধিতা এবং কঠোর অবস্থানের পক্ষে পরিচিত। তাদের সঙ্গে গালিবাফের মতপার্থক্য এখন শুধু প্রেসিডেন্টকে ঘিরে নয়; পার্লামেন্টের নেতৃত্ব ও রক্ষণশীল শিবিরের ভবিষ্যৎ নিয়েও তা বিস্তৃত হয়েছে।

যুদ্ধের মধ্যে আরও তীব্র হচ্ছে দ্বন্দ্ব

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার সময়েই এই রাজনৈতিক বিরোধ সামনে এসেছে। যুদ্ধের পরিস্থিতি তেহরানে একটি মৌলিক প্রশ্নকে আরও তীব্র করেছে—ইরান কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করবে, নাকি সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে প্রতিরোধ শক্তিশালী করবে?

কট্টরপন্থীরা পেজেশকিয়ানের সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন। তাদের কেউ কেউ প্রেসিডেন্টকে নতুন সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ অমান্য করার এবং প্রেসিডেন্ট পদে থাকার মতো রাজনৈতিক সক্ষমতা না থাকার অভিযোগে তার পদত্যাগও দাবি করেছেন।

এর পাশাপাশি সরকারের ওপর হিজাবনীতি ও অন্যান্য সামাজিক ইস্যুতেও চাপ বাড়ানো হচ্ছে। ইরানের সংবাদপত্র এত্তেমাদ মনে করছে, এসব রাজনৈতিক চাপের ফলে সরকারকে অর্থনৈতিক ও জনজীবনের সংকট মোকাবিলার বদলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ সামলাতে বেশি সময় ব্যয় করতে হতে পারে।

সংসদও বিভক্ত

যুদ্ধ শুরুর পর নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ইরানের পার্লামেন্ট নিয়মিত সশরীরে অধিবেশন করছে না। ফলে পেজেশকিয়ানকে সরানোর উদ্যোগ নিয়ে যে বৈঠক হয়েছিল, সেটিও আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়নি।

কট্টরপন্থী কিছু আইনপ্রণেতা অভিযোগ করেছেন, গালিবাফ নিরাপত্তার বিষয়টিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সংসদের সরাসরি অধিবেশন ঠেকাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, এর ফলে প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিরুদ্ধে সংসদীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তবে পেজেশকিয়ানকে অপসারণের উদ্যোগ এখনো আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় কতটা এগিয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। সংবিধান অনুযায়ী প্রক্রিয়া শুরু করতেই অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। আর প্রেসিডেন্টকে অপসারণ করতে প্রয়োজন দুই-তৃতীয়াংশ এমপির সমর্থন।

এখন পর্যন্ত এমন কোনো ইঙ্গিত নেই যে পেজেশকিয়ানকে অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কট্টরপন্থীদের হাতে রয়েছে।

তবু এই ঘটনাকে তেহরানের ক্ষমতার কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের দুর্বলতার মধ্যে প্রেসিডেন্টকে সরানোর দাবি রক্ষণশীল শিবিরের ভেতরকার বিভাজনকে আরও প্রকাশ্য করে তুলেছে।

অর্থাৎ, ইরানে বর্তমান রাজনৈতিক লড়াইটি কেবল পেজেশকিয়ানের সরকার বনাম কট্টরপন্থীদের নয়। বরং কে রক্ষণশীল শিবিরের নেতৃত্ব দেবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোন পথ নেওয়া হবে এবং যুদ্ধকালীন রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—সেই বৃহত্তর প্রশ্নও এখন সামনে চলে এসেছে।