ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে ইরান-চীন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক

ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাঘচি। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সম্মেলনের পার্শ্ববৈঠকে দুই দেশের শীর্ষ কূটনীতিকের মধ্যে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের বিস্তারিত বিষয়বস্তু তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

তবে এমন এক সময়ে আরাঘচি ও ওয়াং ইর বৈঠক হলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একতরফা নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি ব্রিকস সম্মেলনের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সম্মেলনে ইরানও বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং একতরফাবাদের বিরুদ্ধে অবস্থানের ওপর জোর দিয়েছে।

নয়াদিল্লিতে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) শুরু হওয়া দুই দিনের এ সম্মেলনে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর নেতারা অংশ নিয়েছেন। সম্প্রসারণের পর সংগঠনটির পরিসর আরও বেড়েছে এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মঞ্চ হিসেবে ব্রিকসের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে।

সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সদস্য দেশগুলো। শনিবার গৃহীত নয়াদিল্লি ঘোষণায় সংঘাত নিরসনে সর্বোচ্চ সংযম, সংলাপ, পরামর্শ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া আরোপ করা একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেও অবস্থান জানিয়েছে ব্রিকস।

ব্রিকস সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও বহুপক্ষীয়তা শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, একতরফাবাদ ফিরে এলে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে। বড় কিংবা ছোট, সব দেশের অধিকার ও সার্বভৌমত্ব সমানভাবে রক্ষা করা না গেলে কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা টেকসই হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পেজেশকিয়ান আরও বলেন, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা এখন সময়ের দাবি। জাতিসংঘ সনদ যদি অবৈধ শক্তিপ্রয়োগ থেকে রাষ্ট্রগুলোকে রক্ষা করতে না পারে এবং আন্তর্জাতিক আইন যদি কিছু দেশের জন্য বাধ্যতামূলক হলেও অন্যদের ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সেটিকে প্রকৃত বহুপক্ষীয়তা বলা যায় না।

ইরানি প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে গাজা ও লেবাননের বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগও উঠে আসে। যুদ্ধ, আগ্রাসন ও গণহত্যার মতো পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ব্রিকসের বৈঠকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। নিরাপত্তা পরিষদসহ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার দাবিও সম্মেলনে উঠে এসেছে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ব্রিকসের ভূমিকা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সদস্য দেশগুলো বাণিজ্যিক বাধা কমানো, পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং পশ্চিমা-নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প সহযোগিতার সুযোগ তৈরির বিষয়ে আলোচনা করেছে। ইরানও ব্রিকসের আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে।

এমন প্রেক্ষাপটেই আরাঘচি ও ওয়াং ইর বৈঠককে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান ও চীন উভয়েই বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একতরফা চাপের বিরোধিতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। ফলে ব্রিকসের মতো মঞ্চে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সরাসরি আলোচনায় আঞ্চলিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির বিভিন্ন বিষয় উঠে আসার সম্ভাবনা থাকলেও বৈঠকের নির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

ব্রিকস সম্মেলন শেষ হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে ব্রিকস নিজেকে শুধু অর্থনৈতিক জোট নয়, বরং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য আরও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। নয়াদিল্লি সম্মেলনের ঘোষণাতেও সেই বহুপক্ষীয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বব্যবস্থার দাবিই গুরুত্ব পেয়েছে। সূত্র: প্রেস টিভি