ইরান যুদ্ধ ব্রিকসকে একদিকে নিজেদের সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর সুযোগ দিলেও অন্যদিকে জোটটির ভেতরের গভীর মতপার্থক্যও স্পষ্ট করে দিয়েছে। নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে চীন, রাশিয়া, ইরান, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা এক টেবিলে বসলেও নতুন বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে এবং তা বাস্তবায়নে কীভাবে এগোনো হবে, এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ঐকমত্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে উঠেছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্মেলনে ব্রিকস নেতাদের ‘নীতি নির্ধারক’ হয়ে ওঠার আহ্বান জানান। কিন্তু একই টেবিলে থাকা দেশগুলোর অনেকের মধ্যেই দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ, সামরিক সংঘাত ও ভিন্ন কৌশলগত অবস্থান রয়েছে। ২০২০ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষ হয়েছিল। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে ইরান ও ব্রিকসের সদস্য সংযুক্ত আরব আমিরাতও বিপরীত অবস্থানে রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে দিল্লিতে এসব নেতাকে সরাসরি আলোচনার টেবিলে আনতে পারাটাই ভারতের জন্য বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের অভিঘাতের পর বিভিন্ন দেশ নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ পেয়েছে এই সম্মেলনে। তবে সম্পর্কের এই নতুন সমীকরণকে বাস্তব ও দৃশ্যমান ফলাফলে রূপ দেওয়া যে সহজ নয়, সম্মেলনের পুরো আয়োজনজুড়েই তার ইঙ্গিত ছিল।
পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প
চীন, রাশিয়া ও ইরানের মতো সদস্যদের কাছে ব্রিকস যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের প্রভাব কমিয়ে একটি বিকল্প শক্তির ভারসাম্য তৈরির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে ভারত ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে তুলে ধরতে বরাবরই সতর্ক।
সম্মেলনে মোদিও স্পষ্ট করে বলেছেন, ব্রিকস ‘কারও বিরুদ্ধে নয়’। দিল্লির জন্য এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত একই সঙ্গে এমন দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে চায়, যাদের নিজেদের মধ্যে তীব্র বিরোধ রয়েছে।
ভারতের সাবেক কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়েতের মতে, ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী জোটে পরিণত করার আগ্রহ কিছু সদস্যের মধ্যে থাকলেও ভারত সেটিকে সেই পথে নিতে চায় না। বরং যুদ্ধের সময়ে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে দিল্লি।
ঘোষণাপত্রে ঐক্য, আড়ালে মতভেদ
ব্রিকস সম্মেলনের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল একটি যৌথ ঘোষণাপত্র গ্রহণ। চলতি বছর এর আগের দুটি মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যৌথ বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়নি। এবার ঐকমত্য তৈরি হলেও তীব্র মতবিরোধ থাকা বিষয়গুলো এড়িয়ে গিয়েই সেই ঐকমত্য গড়ে তোলা হয়েছে।
নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে সর্বোচ্চ সংযমের আহ্বান জানানো হয়েছে। বেসামরিক অবকাঠামো ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা জানানো হলেও কোনো দেশকে সরাসরি দায়ী করা হয়নি।
ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বিরোধিতা এবং দখলদারিত্বকে বৈধতা দেওয়া বা দীর্ঘায়িত করতে পারে, এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়া হয়েছে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ঘোষণাপত্রে কোনো বক্তব্য রাখা হয়নি, যা আগের ব্রিকস ঘোষণাপত্রগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সতর্কতা দেখা গেছে। নির্বিচারে বাড়তে থাকা শুল্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানানো হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে নিজেদের অবস্থান জানানোর চেষ্টা করেছে ব্রিকস।
ইরান-আমিরাত বৈঠকে নতুন বার্তা
সম্মেলনের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের বৈঠক। যুদ্ধ শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি বৈঠক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইরানের জন্য সম্মেলনটি নিজেদের কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন নয়, এই বার্তা দেওয়ারও সুযোগ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা, অর্থনৈতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা এবং বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধের মধ্যে পেজেশকিয়ান ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার ওপর জোর দিয়েছেন।
মালয়েশিয়া, ভারত ও ইথিওপিয়ার নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন পেজেশকিয়ান। অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং ইরানের সক্ষমতাগুলো ব্রিকসের যৌথ কর্মকাণ্ডে কাজে লাগানোর বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
ভারত-চীন সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দিল্লি সফরও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারত-চীন সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের উত্তেজনা কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতিও রয়েছে, যার ভার চীনের দিকে বেশি।
দিল্লিতে শি ও মোদির মধ্যে বৈঠকে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও পরিবহন যোগাযোগ বাড়ানো এবং বাণিজ্যের বাধাগুলো দূর করার বিষয়ে একমত হওয়ার কথা জানিয়েছে দুই দেশ। তবে সম্পর্কের এই উষ্ণতা বাস্তবে কতটা বড় অগ্রগতিতে রূপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এরপর কী
নয়াদিল্লির সম্মেলন দেখিয়েছে, পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও আলোচনার সুযোগ করে দিতে পারে ব্রিকস। ইরান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ে চাপের মধ্যে এই ভূমিকার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
তবে ব্রিকসের সদস্যরা নতুন একটি বিশ্বব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যতটা একমত, সেই নতুন ব্যবস্থা ঠিক কেমন হবে এবং কীভাবে সেখানে পৌঁছানো যাবে, সে বিষয়ে ঐকমত্য ততটাই দুর্বল। ফলে নয়াদিল্লি সম্মেলন ব্রিকসের কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়ালেও একই সঙ্গে জোটটির অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা ও মতভেদের চিত্রও স্পষ্ট করে দিয়েছে। সূত্র: বিবিসি