কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিকাশকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে এআই ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য কতটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা নিয়ে প্রযুক্তিবিদ ও নিরাপত্তা গবেষকদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই চলতি মাসের শেষ দিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হতে পারে এআই পরিচালনা ও নিরাপত্তা।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। অ্যানথ্রপিকের এক নিরাপত্তা গবেষক সতর্ক করে বলেছেন, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যেই এআই এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য ভয়াবহ হুমকি তৈরি করবে। এমনকি তিনি আশঙ্কা করেছেন, প্রযুক্তিটি একপর্যায়ে ‘সব মানুষকে হত্যা’ করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এই মন্তব্য এআই নিরাপত্তা নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
এআই কি যুক্তরাষ্ট্র-চীনের নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র?
ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই এআই উন্নয়নকে চীনের সঙ্গে একটি কৌশলগত প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে এআই শুধু অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
উন্নত এআই মডেল, সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা সেন্টার, কম্পিউটিং সক্ষমতা এবং অত্যাধুনিক চিপ—সবকিছুকে কেন্দ্র করেই দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, চীন যদি এআই প্রযুক্তিতে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করে, তাহলে সামরিক সক্ষমতা, সাইবার নিরাপত্তা, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং অর্থনীতিতে দেশটি বড় কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে। অন্যদিকে চীনের দৃষ্টিভঙ্গি কি একই? এই প্রশ্নটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের এআই উচ্চাকাঙ্ক্ষা কোথায়?
চীন এআইকে ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। দেশটি নিজস্ব এআই মডেল, চিপ, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং শিল্পক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে।
তবে চীনের এআই নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—প্রযুক্তির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় স্বার্থকে বড় গুরুত্ব দেওয়া।
অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে তুলনামূলকভাবে বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানি ও বাজারভিত্তিক উদ্ভাবনের ওপর বেশি নির্ভর করে, চীনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, নিয়ন্ত্রণ এবং কৌশলগত শিল্পনীতির ভূমিকা অনেক বেশি।
ফলে দুই দেশের এআই উন্নয়নের লক্ষ্য কিছু জায়গায় একই হলেও পদ্ধতিতে বড় পার্থক্য রয়েছে।
প্রতিযোগিতার মাঝেও সহযোগিতা কি সম্ভব?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যদি এআইকে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্র হিসেবে দেখে, তাহলে নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয় কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
কারণ এআইয়ের ঝুঁকি কোনো একটি দেশের সীমান্তে আটকে থাকবে না।
একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এআই সিস্টেম যদি ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, সাইবার হামলা চালাতে সক্ষম হয়, ভুল তথ্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয় কিংবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তার প্রভাব বিশ্বের যেকোনো দেশে পড়তে পারে।
আর এআই যখন সামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবে, তখন ঝুঁকির মাত্রা আরও বাড়তে পারে।
‘এআই অস্ত্র প্রতিযোগিতা’ নিয়ে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যদি এআই উন্নয়নে একটি পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তাহলে দুই দেশই হয়তো দ্রুততর ও আরও শক্তিশালী সিস্টেম তৈরির দিকে ছুটবে।
তখন নিরাপত্তা পরীক্ষা, ঝুঁকি মূল্যায়ন কিংবা নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
একটি দেশ যদি মনে করে অন্য দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তাহলে তারা নিরাপত্তার কিছু শর্ত শিথিল করে দ্রুত প্রযুক্তি উন্নয়নের দিকে যেতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিকে অনেক বিশ্লেষক ‘এআই রেস টু দ্য বটম’ হিসেবে দেখছেন—যেখানে কে আগে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি তৈরি করবে, সেই প্রতিযোগিতাই মুখ্য হয়ে উঠবে।
আবার সহযোগিতার প্রয়োজনও সবচেয়ে বেশি
পরিহাসের বিষয় হলো, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজনও সবচেয়ে বেশি।
দুই দেশ যদি এআই নিরাপত্তার জন্য কিছু মৌলিক আন্তর্জাতিক নীতি তৈরি করতে পারে, তাহলে সম্ভাব্য বিপদ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
যেমন— অত্যন্ত শক্তিশালী এআই মডেলের নিরাপত্তা পরীক্ষা; বিপজ্জনক সক্ষমতার স্বাধীন মূল্যায়ন; এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানব নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা; সামরিক ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সীমা নির্ধারণ; এআই-নির্ভর সাইবার হামলা প্রতিরোধ; বিপজ্জনক এআই সিস্টেম শনাক্ত করার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তথ্য বিনিময়।
এ ধরনের ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ন্যূনতম সমঝোতা তৈরি হলে তা বিশ্বব্যাপী এআই নিরাপত্তা কাঠামো গঠনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সবচেয়ে বড় বাধা—পারস্পরিক অবিশ্বাস
কিন্তু সহযোগিতার পথে প্রধান বাধা প্রযুক্তিগত নয়, বরং রাজনৈতিক। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, তাইওয়ান, চিপ প্রযুক্তি, সামরিক নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
এই অবিশ্বাসের পরিবেশে একটি দেশ অন্য দেশের এআই সক্ষমতা সম্পর্কে সংবেদনশীল তথ্য কতটা ভাগ করবে—সেটি বড় প্রশ্ন।
বিশেষ করে কোনো প্রযুক্তি যদি সামরিক ও বেসামরিক—দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহারযোগ্য হয়, তখন সহযোগিতার সীমা নির্ধারণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
শি-ট্রাম্প বৈঠক তাই গুরুত্বপূর্ণ
এই প্রেক্ষাপটে শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকে এআই গভর্ন্যান্স বা এআই পরিচালনা নিয়ে আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব বহন করতে পারে।
দুই নেতা যদি এআইকে কেবল অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা হিসেবে না দেখে বৈশ্বিক নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে ভবিষ্যতের জন্য কিছু নীতিগত সমঝোতার দরজা খুলতে পারে।
তবে দুই দেশের মধ্যে বড় কোনো চুক্তি রাতারাতি হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
বরং প্রথম ধাপে ঝুঁকিপূর্ণ এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে যোগাযোগের চ্যানেল তৈরি, জরুরি পরিস্থিতিতে তথ্য বিনিময় এবং ন্যূনতম নিরাপত্তা মানদণ্ড নির্ধারণের মতো বিষয় সামনে আসতে পারে।
মানবজাতির জন্য আসল ঝুঁকি কোথায়?
এআই নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু ‘কে এগিয়ে থাকবে’ নয়। প্রশ্ন হলো—কে কতটা নিরাপদে এগোবে?
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যদি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এআই প্রযুক্তি তৈরিতে প্রতিযোগিতা করে, তাহলে তা বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। কিন্তু নিরাপত্তা কাঠামো ছাড়া একই প্রতিযোগিতা বড় ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
এআই গবেষকদের সতর্কবার্তা তাই পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। মানবজাতির জন্য বিপদের মাত্রা নিয়ে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে ক্রমেই ঐকমত্য তৈরি হচ্ছে—এআই যত শক্তিশালী হবে, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও তত বাড়বে। আর সেই দায়িত্ব শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের একার নয়।
সামনে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্ব এখন এমন এক প্রযুক্তিগত মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন চাইলে এআইকে নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রধান অস্ত্র বানাতে পারে। আবার চাইলে দুই দেশ নিজেদের প্রতিযোগিতা বজায় রেখেও কিছু মৌলিক নিরাপত্তা নীতিতে সহযোগিতা করতে পারে।
এই দুই পথের মধ্যে কোনটি বেছে নেওয়া হবে, তার প্রভাব শুধু ওয়াশিংটন বা বেইজিংয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
কারণ এআইয়ের ভবিষ্যৎ যদি সত্যিই মানব সভ্যতার গতিপথ বদলে দেওয়ার মতো শক্তিশালী হয়, তাহলে এর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সিদ্ধান্তও হয়ে উঠবে পুরো বিশ্বের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।