বার্নহামই তবে কি যুক্তরাজ্যের সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী?

আধুনিক যুক্তরাজ্য পেরিয়েছে শতবর্ষ। ১৯২২ সালে গঠিত এই সাম্রাজ্য এখন যেন পতনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। গ্রেট ব্রিটেন, ইউনাইটেড কিংডম, ইউকে বা যুক্তরাজ্য নামগুলোকে হয়তো বিদায় জানানোর সময় এসে গেছে। সম্ভবত অ্যান্ডি বার্নহামই হতে চলেছেন যুক্তরাজ্যের শেষ প্রধানমন্ত্রী। এই বিদায়ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছে একটি বৈঠক। যে বৈঠক থেকে এমন একটি সম্ভবনার বিষয়ই এখন সামনে এসেছে।

ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের চারজন নেতা ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি, ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার রুন আপ ইয়োরওর্থ, উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার মিশেল ও'নিল এবং আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের বিরোধী দলীয় নেত্রী মেরি লু ম্যাকডোনাল্ড। সেই বৈঠকে এই চার নেতা একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। তাদের সমবেত হওয়ার মূল উদ্দেশ্যই ছিল এই চুক্তি স্বক্ষর।

যুক্তরাজ্য থেকে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবিকে এগিয়ে নিতেই চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। সেই চুক্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে: ওয়েস্টমিনস্টারের সময় শেষ হয়ে আসছে। অর্থাৎ যুক্তরাজ্য এখন বিভাজনের মুখে দাঁড়িয়ে। স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড এবার ইংল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটাতে চায়।

স্কটল্যাণ্ডে বৃহত্তম রাজনৈতিক দল স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি)। এটি একটি জাতীয়তাবাদী দল এবং তারা বছরের পর বছর ধরে স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ওয়েলসের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হলো প্লেইড কামরি। তারাও একটি স্বাধীনতাপন্থী দল এবং তারা এই বছর প্রথমবারের মতো সবচেয়ে বড় ওয়েলশ দল হিসেবে উঠে এসেছে। আর উত্তর আয়ারল্যাণ্ডের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হলো সিন ফেইন। এটিও জাতীয়তাবাদী দল। এই দলটি যুক্তরাজ্য থেকে স্বাধীনতা এবং সমগ্র আয়ারল্যান্ডের পুনরেকত্রীকরণকে সমর্থন করে এসেছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই তিনটি দেশেই এখন জাতীয়তাবাদী দলগুলো ক্ষমতায়। আর এই সমস্ত দলগুলো ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটাতে একসাথে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বৈঠক শেষে তারা লন্ডনকে সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিতে, পরিকল্পনা করতে এবং সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছে। ইংল্যান্ডকে তাদের গুছিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়ার এটি কূটনৈতিক ভাষা। কারণ এই দেশগুলো যুক্তরাজ্য থেকে মুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন তারা নিজ নিজ দেশের ক্ষমতাসীন দল হিসেবে স্বাধীনতা গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনা করছে।

বিশ্বব্যাপী একসময় দেশভাগের মূল কারিগর ছিল লন্ডন। ১৯০৫ সালে তারা প্রথম বঙ্গভঙ্গ করেছিল। ১৯২১ সালে তারা আয়ারল্যান্ডকে বিভক্ত করে। আর ১৯৪৭ সালের আগস্টে তারা এমন এক দেশভাগ ঘটিয়েছিল যা আজও প্রায় ২০০ কোটি মানুষকে বিভাজিত করে রেখেছে; সেটি ভারত ভাগ। এখন সেই লন্ডনই পড়েছে নতুন এক গাড্ডায়। তাদের অধিভূক্ত দেশগুলোই এখন বিভাজন চাইছে। তাদের এখন লড়াই যেটা শুরু হয়েছে সেটা নিছকই ক্ষমতার জন্য নয়; বরং তা ন্যায্যতার জন্য, সমতার জন্য, স্বাধীনতার জন্য।

এই সমস্ত দেশের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন ক্রমশ বাড়ছে, এমনকি সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত ব্যক্তিও তাদের সমর্থ ন করছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি সবসময় আয়ারল্যান্ডের মানুষকে ভালোবেসেছি, এবং আমার কাছে মনে হয় যে আপনার কাছে উত্তর আয়ারল্যান্ড আছে, আবার আয়ারল্যান্ডও আছে; আমার কাছে তো মনে হয় যে সর্বকালের সবচেয়ে স্বাভাবিক বিষয়গুলোর একটি হলো এদের দুুটিকে একত্রিত করে দেওয়া। অবশ্য এটা একান্তই আমার মতামত। তবে অনেকেই এর সাথে একমত। আমার এই মতের প্রতি আমি প্রচুর সমর্থন পেয়েছি। তারপর তারা আমাকে স্কটল্যান্ড সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল। সেটা নিয়ে আমি এখনই কথা বলব না। সেটা অন্য কোনো দিনের জন্য তোলা থাক। তারা স্কটল্যান্ডের কথা বলছিল, কিন্তু আপনারা কিছু মনে না করলে আমি সেটা অন্য দিনের জন্য..।’ ট্রাম্প কার্যত আইরিশ পুনরেকত্রীকরণের পক্ষে কথা বলেছেন। আয়ারল্যান্ডে থাকাকালীন তিনি এই মন্তব্য করেন।

 

ইংল্যান্ড ১৯২১ সালে আয়ারল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলকে বিভক্ত করে। তারা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণ করছে, যেখানে বাকি আয়ারল্যান্ড স্বাধীন। ওয়েলস ষোড়শ শতাব্দী থেকেই লন্ডনের নিয়ন্ত্রণে, এবং স্কটল্যান্ড ১৭০০-এর দশক থেকে ব্রিটেনের অংশ। এই সমস্ত দেশ শত শত বছর ধরে ইংরেজ শাসনের অধীনে রয়েছে। মূলত এই কারণেই সেখানকার নাগরিকরা জাতীয়তাবাদী দলগুলোকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে।

এসব দেশের জাতীয়তাবাদী নেতাদের তাই এখন নাগরিক ইচ্ছাকে মূল্যায়নে কোন বিকল্প নেই। আর একারণেই হয়তো স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি স্বাধীনতার দামামা বাজিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে বার্নহামই হতে চলেছেন যুক্তরাজ্যের শেষ প্রধানমন্ত্রী।