ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র প্রকাশ

পেন্টাগনের এক নজরদারি প্রতিবেদনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৩০টি MQ-9 Reaper ড্রোনসহ কয়েক ডজন উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেলের কার্যালয় সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির প্রথম সরকারি হিসাব তুলে ধরেছে। এতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং সরবরাহব্যবস্থায় ‘বটলনেক’ বা সরবরাহ-জট তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার দেওয়া বিপরীত বক্তব্যেরও অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প এর আগে দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় ‘সীমাহীন’ গোলাবারুদ রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচিত সামরিক অভিযানে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যবহৃত গোলাবারুদের পেছনেই আনুমানিক ২২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। একই সময়ে পুরো যুদ্ধের ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলে নিয়মিত মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক সম্পদে হামলা চালায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো দাবি করেছিল, ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। তবে পেন্টাগনের নতুন প্রতিবেদনে মার্কিন সামরিক বাহিনী ও স্থাপনাগুলোর আগে স্বীকার করা হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতির তথ্য উঠে এসেছে।

US-1

মার্কিন সেনা নিহত ও আহতের সংখ্যা
পেন্টাগনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে অন্তত ১১ জন মার্কিন সামরিক সদস্য ‘যুদ্ধে নিহত’ হয়েছেন। এ ছাড়া সাতজন ‘অ-শত্রুতামূলক ঘটনায়’ মারা গেছেন। ইরানি হামলায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন- ১ মার্চ কুয়েতের শুয়াইবা বন্দরে অন্তত ৬ জন; একই দিনে সৌদি আরবে ১ জন; ১৭ জুলাই জর্ডানের মুয়াফফাক আল-সালতি বা আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে ৩ জন; ১৯ জুলাই ইরাকের এরবিল বিমানঘাঁটিতে ১ জন। এ ছাড়া ১২ মার্চ ইরাকে একটি KC-135 আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন নিহত হন। ১ জুলাই আরব সাগরে একটি MH-60S হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে আরও একজন নিহত হন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০ জুন পর্যন্ত ইরানি হামলায় অন্তত ৪১৭ জন মার্কিন সামরিক সদস্য আহত হয়েছেন।

সেসব সামরিক বিমান হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে যুদ্ধবিমান, জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ বিমান, উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার এবং নজরদারি ড্রোন সবই রয়েছে। F-15E: অন্তত চারটি প্রায় ৩ কোটি ডলার মূল্যের যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ১ মার্চ কুয়েতের আকাশে নিজেদের বাহিনীর গুলিতে ভূপাতিত হয়। আরেকটি এপ্রিলে ইরানের ওপর যুদ্ধের সময় ভূপাতিত হয়। F-35A: অন্তত একটি অত্যাধুনিক স্টেলথ যুদ্ধবিমান মার্চে ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। A-10: অন্তত একটি স্থল-আক্রমণকারী বিমান ইরানি হামলায় ভূপাতিত হয়েছে।

এছাড়াও KC-135: অন্তত সাতটি বড় আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর একটি ১২ মার্চ ইরাকে বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন ক্রু নিহত হন। সৌদি আরবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় আরও পাঁচটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। E-3 Sentry: সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে অন্তত একটি আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। HH-60W: একটি উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

একইসাথে MQ-4C Triton: প্রায় ২৪ কোটি ডলার মূল্যের অন্তত একটি উচ্চ-উচ্চতার নজরদারি ড্রোন এপ্রিলে বিধ্বস্ত হয়েছে। AH-6: উদ্ধার অভিযান চলাকালে উদ্ধার করা সম্ভব নয় বিবেচিত হওয়ায় চারটি ছোট হেলিকপ্টার ধ্বংস করা হয়। AH-64 Apache: ৮ জুন হরমুজ প্রণালির কাছে অন্তত একটি অ্যাটাক হেলিকপ্টার ভূপাতিত হয়েছে। MH-60S: ১ জুলাই আরব সাগরে অন্তত একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়। চার ক্রুর মধ্যে তিনজন আহত অবস্থায় উদ্ধার হলেও একজন নিখোঁজ ছিলেন। MQ-9 Reaper: সর্বোচ্চ ৩০টি দীর্ঘক্ষণ উড়তে সক্ষম সশস্ত্র ড্রোন ধ্বংস হয়েছে। ইরান আরও কয়েকটি মার্কিন নজরদারি ও আক্রমণকারী ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে। তেহরান এ মাসের শুরুতে একটি মার্কিন Dive-LD সাবমার্সিবলও আটক করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
পেন্টাগনের প্রতিবেদনে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ইরানি হামলায় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর শত শত ভবন ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। তবে এসব ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট বিবরণ প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত নৌঘাঁটি ও সহায়ক বন্দর নিশ্চিত করা যুদ্ধের আগে ও চলাকালে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মিত্র দেশগুলোর বন্দর ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহব্যবস্থার জটিলতা এর অন্যতম কারণ।

উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাতে হামলা
ইরানি হামলায় ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোট ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক মূল্য ১৮৪ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া বাগদাদ, জেরুজালেম, তেল আবিব, কায়রো, আম্মান, কুয়েত সিটি ও মাসকাটে কর্মীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সূত্র: আল-জাজিরা