ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র নতুন করে সামনে এসেছে। মার্কিন প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ১১ মডেলের অন্তত ৫২টি যুদ্ধবিমান ও ড্রোন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই তালিকায় একদম সামনের সারির যুদ্ধবিমান ও অ্যাটাক এয়ারক্রাফট থেকে শুরু করে আকাশে যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার বিমান, উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার—সবই রয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের মহাপরিদর্শকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গতকাল সোমবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে ইরানে হামলা চালানোর শুরুর দিন (২৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে গত ৩০ জুন পর্যন্ত যুদ্ধে ওয়াশিংটনের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান (৪টি): দুই আসনবিশিষ্ট ও তিন কোটি ডলার মূল্যের এফ–১৫ই মডেলের অন্তত চারটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। আকাশ থেকে ভূমিতে এবং আকাশ থেকে আকাশে হামলার জন্য এই যুদ্ধবিমানগুলো ব্যবহৃত হয়। গত ১ মার্চ অন্তত তিনটি যুদ্ধবিমান কুয়েতে ফ্রেন্ডলি ফায়ারে ভূপাতিত হয়। এই মডেলের চতুর্থ যুদ্ধবিমানটি গত এপ্রিলে ইরান গুলি করে নামায়। সব যুদ্ধবিমানের পাইলটকেই উদ্ধার করে ওয়াশিংটন।
এফ-৩৫এ (১টি): যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত মূল্যবান ও সর্বাধুনিক এফ-৩৫এ মডেলের এই স্টিলথ মাল্টিরোল যুদ্ধবিমানটি প্রতিপক্ষের সুরক্ষিত আকাশসীমা ভেদ করতে সক্ষম। গত মার্চ মাসে ইরানের হামলায় এই মডেলের অন্তত একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ-১০ (১টি): প্রধানত পদাতিক বাহিনীকে সরাসরি বা কাছাকাছি আকাশ থেকে সহায়তা (ক্লোজ এয়ার সাপোর্ট) দিতে সক্ষম এ–১০ মডেলের এই অ্যাটাক এয়ারক্রাফট। ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই মডেলের অন্তত একটি এয়ারক্রাফট ভূপাতিত হয়েছে।
কেসি-১৩৫ (৭টি): মার্কিন যুদ্ধবিমানের উড্ডয়নসীমা ও স্থায়িত্ব বাড়াতে ব্যবহৃত কেসি–১৩৫ মডেলের এই বিশাল আকারের ট্যাংকার বিমানের অন্তত সাতটি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। আকাশেই যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি সরবরাহকারী (এরিয়াল-রিফুয়েলিং) হিসেবে এটা কাজ করে।
১২ মার্চ ইরাকে জ্বালানি সরবরাহ মিশন চলাকালে একটি বিধ্বস্ত হয়। এতে ছয়জন ক্রু সদস্যই নিহত হন। সৌদি আরবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ভূমিতে থাকা এই মডেলের পাঁচটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সপ্তম বিমানটিও ইরাকের ওই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির গণনায় এটিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ই-৩ সেন্ট্রি (১টি): সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় ই–৩ সেন্ট্রি মডেলের অন্তত একটি মার্কিন বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বিমান আগাম আকাশ-সতর্কবার্তা এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার জন্য কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।
এইচএইচ-৬০ডব্লিউ হেলিকপ্টার (১টি)
যুদ্ধক্ষেত্রে সন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের (কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ মিশন) সময় ইরানের হামলায় চার ব্লেড ও জোড়া ইঞ্জিনের এই মাঝারি ক্যাটাগরির সামরিক ইউটিলিটি হেলিকপ্টারগুলোর অন্তত একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এমকিউ-৪সি ট্রাইটন (১টি): প্রধানত সামুদ্রিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারির জন্য এমকিউ-৪সি ট্রাইটন তৈরি করা হয়েছে। ২৪ কোটি ডলার মূল্যের উচ্চ-উচ্চতার ও দীর্ঘস্থায়ী মানুষবিহীন নজরদারি এই মার্কিন বিমানের (ড্রোন) অন্তত একটি গত এপ্রিল মাসে বিধ্বস্ত হয়।
এএইচ-৬ হেলিকপ্টার (৪টি): ইরানে একটি যুদ্ধকালীন অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালানোর সময় উদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে পড়ায় মার্কিন বাহিনী নিজেরাই চারটি এএইচ-৬ হেলিকপ্টার ধ্বংস করে। আকারে ছোট এবং অত্যন্ত সহজে কৌশল পরিবর্তনে সক্ষম এই হেলিকপ্টারগুলো উদ্ধার অভিযানে বিশেষ কার্যকর।
এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি (১টি): দুজন ক্রুর জন্য পরপর সাজানো ককপিটসহ নির্মিত জোড়া ইঞ্জিন ও চার ব্লেডের এই অ্যাটাক হেলিকপ্টার এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি। এই মডেলের অন্তত একটি হেলিকপ্টার ৮ জুন হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি গুলি করে নামায় ইরানের বাহিনী।
এমএইচ-৬০এস (১টি): মার্কিন নৌবাহিনীর এমএইচ-৬০এস মডেলের হেলিকপ্টারগুলোর অন্তত একটি গত ১ জুলাই আরব সাগরে বিধ্বস্ত হয়। এই হেলিকপ্টারে থাকা চারজন ক্রু সদস্যের মধ্যে তিনজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। চতুর্থজনকে না পেয়ে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।
এমকিউ-৯ রিপার (৩০টি): নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং নিখুঁত নিশানায় আঘাত হানার কাজে দারুণ কার্যকর এমকিউ-৯ রিপার। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র এই চালকবিহীন বিমানগুলোর (ড্রোন) অন্তত ৩০টি ধ্বংস হয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের আরও ক্ষতিসাধনের দাবি করেছে। যার মধ্যে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি বেশ কয়েকবার মার্কিন নজরদারি ও অ্যাটাক ড্রোন গুলি করে নামানোর বিষয় রয়েছে। এ ছাড়া চলতি মাসের শুরুর দিকে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডাইভ-এলডি’ নামের একটি সাবমার্সিবলও জব্দ করেছে।