মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য 'সবচেয়ে বড় হুমকি' ইসরায়েল: সিরিয়া

মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য ইসরায়েলকে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে সিরিয়া। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সিরিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি ইব্রাহিম ওলাবি অভিযোগ করেন, সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান, বিমান হামলা ও অনুপ্রবেশ পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে ওলাবি বলেন, ইসরায়েলি কর্মকাণ্ড শুধু সিরিয়ার জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্যই বড় হুমকি তৈরি করেছে। তিনি দাবি করেন, দামেস্ক যখন কূটনৈতিক আলোচনা ও নিরাপত্তা সমঝোতার পথে এগোচ্ছে, তখন ইসরায়েল বিমান হামলা ও সামরিক অনুপ্রবেশের মাধ্যমে তার জবাব দিচ্ছে।

নেটানিয়াহুর হেরমন সফর নিয়ে ক্ষোভ

সিরিয়ার অভিযোগের অন্যতম কেন্দ্র ছিল ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক মাউন্ট হেরমন সফর। ৯ সেপ্টেম্বর নেতানিয়াহু ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ও সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সিরিয়ার ভূখণ্ডে অবস্থিত হেরমন পর্বতের একটি সামরিক অবস্থান পরিদর্শন করেন।

দামেস্ক ওই সফরকে সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং ১৯৭৪ সালের ইসরায়েল-সিরিয়া বিচ্ছিন্নতাকরণ চুক্তি বাস্তবায়নে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানায়।

নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের আগে ৪৪টি দেশও ইসরায়েলি নেতৃত্বের ওই সফরকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করেছে বলে সিরিয়া উল্লেখ করেছে।

ইসরায়েলের পাল্টা অভিযোগ তুরস্ককে ঘিরে

সিরিয়ার অভিযোগের জবাবে জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন আলোচনার কেন্দ্র তুরস্কের দিকে ঘুরিয়ে দেন।

ড্যাননের দাবি, সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি ইসরায়েলের তুলনায় অনেক বেশি। তিনি দাবি করেন, সিরিয়ায় তুরস্কের প্রায় ২০ হাজার সেনা ও শতাধিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং দেশটির প্রায় ৫ শতাংশ ভূখণ্ডে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। তিনি ইসরায়েলের দক্ষিণ সিরিয়ার সামরিক অবস্থানকে ‘প্রতিরক্ষামূলক বাফার’ হিসেবে তুলে ধরেন। তবে তুরস্ক এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

জাতিসংঘে তুরস্কের রাষ্ট্রদূত আহমেত ইলদিজ বলেন, সিরিয়ায় তুর্কি সেনাদের উপস্থিতি দামেস্কের আমন্ত্রণেই হয়েছে। ইসরায়েল তুরস্কের সঙ্গে সিরিয়ার বৈধ সহযোগিতাকে হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করে নিজেদের কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা তৈরির চেষ্টা করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

সিরিয়ার নতুন বাস্তবতায় বিদেশি সেনা

সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর দেশটির নতুন প্রশাসন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। এর মধ্যেই দেশটির ভূখণ্ডে বিভিন্ন বিদেশি শক্তির সামরিক উপস্থিতি নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সিরিয়া-সংক্রান্ত আলোচনায় ইসরায়েলের দক্ষিণ সিরিয়ায় সামরিক উপস্থিতি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তা পরিষদবিষয়ক পর্যবেক্ষণ সংস্থা Security Council Report জানিয়েছে, ১৯৭৪ সালের বিচ্ছিন্নতাকরণ চুক্তির সীমারেখার পূর্বদিকে ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

সিরিয়া বলছে, তারা আঞ্চলিক সংঘাত থেকে নিজেদের দূরে রাখতে চায় এবং প্রতিবেশী কোনো দেশের জন্য হুমকি হতে চায় না। একই সঙ্গে দামেস্কের অবস্থান হলো—নিরাপত্তা সমঝোতা বা কূটনৈতিক আলোচনা মানেই নিজেদের ভূখণ্ডে বিদেশি সামরিক উপস্থিতি মেনে নেওয়া নয়।

তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে দামেস্ক

এদিকে সিরিয়ার নতুন প্রশাসনের সঙ্গে তুরস্কের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগও বাড়ছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান চলতি সপ্তাহে দামেস্ক সফর করে প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারার সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

ফিদান এর আগে বলেছিলেন, বর্তমানে সিরিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য হুমকি ইসরায়েল। তার মতে, সিরিয়ার পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতার প্রচেষ্টার মধ্যে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ড নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।

তুরস্ক একই সঙ্গে সিরিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করছে। ১৩ সেপ্টেম্বর ফিদান সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ হাসান আল-শাইবানী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আনাস খাত্তাবের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকও করেন।

সামনে আরও কূটনৈতিক চাপ

সিরিয়া এখন রাজনৈতিক রূপান্তর, নিরাপত্তা পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতি এবং অন্যান্য বিদেশি শক্তির ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সিরিয়ার অভিযোগের পর ইসরায়েল ও তুরস্কের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও দেখিয়েছে, সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থান এখনও পরস্পর থেকে অনেক দূরে।

ফলে সিরিয়ার রাজনৈতিক রূপান্তরের পাশাপাশি দেশটির সার্বভৌমত্ব, বিদেশি সেনা উপস্থিতি এবং ১৯৭৪ সালের ইসরায়েল-সিরিয়া বিচ্ছিন্নতাকরণ চুক্তির ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন আগামী দিনগুলোতে জাতিসংঘের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকতে পারে।