জাতিসংঘে ট্রাম্পের ভাষণে প্রাধান্য পাবে গাজা ও ইরান যুদ্ধ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে (ইউএনজিএ) দেওয়া ভাষণে গাজা যুদ্ধ অবসানের পরিকল্পনা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিয়ে কথা বলবেন। একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গেও বহুপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার।

জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ জানিয়েছেন, ট্রাম্পের ভাষণে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংঘাত মোকাবিলায় তার প্রশাসনের নেওয়া উদ্যোগগুলো তুলে ধরা হবে। আগের প্রশাসনগুলোর সময়ে যেসব আন্তর্জাতিক ইস্যু অবহেলিত ছিল বলে বর্তমান প্রশাসন মনে করে, সেগুলো নিয়েও কথা বলবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ওয়াল্টজের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প বিশেষভাবে ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরবেন। পাশাপাশি গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং গাজা সংকট মোকাবিলায় প্রশাসনের ২০ দফা পরিকল্পনার অগ্রগতিও তার বক্তব্যে স্থান পেতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত ২০ দফা গাজা পরিকল্পনাকে ওয়াশিংটন যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা ও সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের একটি কাঠামো হিসেবে তুলে ধরছে। তবে পরিকল্পনাটির বিভিন্ন দিক নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান এক নয়।

ফলে জাতিসংঘে ট্রাম্পের বক্তব্যে পরিকল্পনাটির কোন অংশে অগ্রগতি হয়েছে এবং বাস্তবায়নের পথে কী ধরনের বাধা রয়েছে—সেদিকেও আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকবে।

গাজা ইস্যুতে যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা, জিম্মি ও বন্দি বিনিময়, গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন এবং পুনর্গঠন—এসব বিষয় ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্পের ভাষণে ইরান প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি ও নৌ-বাণিজ্যে প্রভাব ফেলেছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রভাব এবং এর পরিণতি নিয়ে জাতিসংঘে ট্রাম্পকে বিভিন্ন দেশের নেতাদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগও দীর্ঘদিনের। মার্কিন প্রশাসন বলছে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। অন্যদিকে তেহরান বরাবরই বলে আসছে, তার পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা তাদের নেই।

এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বে একটি সীমিত ইরানি প্রতিনিধিদল অংশ নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে একই সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের শীর্ষ পর্যায়ের বক্তব্যও জাতিসংঘের মঞ্চে সামনে আসবে।

ইউএনজিএর ফাঁকে ট্রাম্প উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ—জিসিসির সদস্য দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন বলে এরই মধ্যে খবর এসেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমান এই জোটের সদস্য।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের প্রভাব, বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে এসব দেশের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতা এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে বিঘ্ন ঘটায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর ওপরও এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।

একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ফাঁকে ট্রাম্প কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও করবেন বলে জানিয়েছেন ওয়াল্টজ। মঙ্গলবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তার বৈঠকের কথা রয়েছে।

এর মধ্যে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে, কারণ এর পরই ট্রাম্পের চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। ফলে পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা, চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং তাইওয়ান ইস্যুও আলোচনায় আসতে পারে।

এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইরান যুদ্ধ, গাজা সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা—সবগুলো ইস্যু পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে ট্রাম্পের ভাষণে যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারগুলো কীভাবে তুলে ধরে, সেদিকে আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকবে।