ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ ভাঙা বর্তমানে কঠিন হয়ে উঠেছে। এর অন্যতম কারণ দেশটির দুর্গম ও পাহাড়ি ভূখণ্ড। পাহাড়ের উঁচু অবস্থান নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে হুথিরা উপকূলীয় এলাকা থেকে পিছু হটে পাহাড়ে আশ্রয় নিতে এবং পরে আবার ফিরে আসতে পারে। সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্ঞান উৎপাদনবিষয়ক নির্বাহী পরিচালক ইয়াসমিন আল-এরিয়ানি আল জাজিরাকে বলেন, বর্তমানে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক বিকল্প সীমিত। কারণ সংঘাতের বড় অংশ এমন পাহাড়ি এলাকায় হচ্ছে, যেখানে প্রতিপক্ষের পক্ষে পৌঁছানো এবং দীর্ঘ সময় অবস্থান ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রধান সংঘর্ষ চলছে কাহবুবের কৌশলগত পাহাড়ি এলাকায়। এসব উচ্চভূমি পুরোপুরি হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হবে। ইয়াসমিন আল-এরিয়ানির মতে, পাহাড়ের চূড়া ও উঁচু অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করা যেকোনো বাহিনীর জন্য বড় সামরিক সুবিধা তৈরি করে। সেখান থেকে নিচের উপকূলীয় এলাকা পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে আক্রমণের মুখে হুথিরা উপকূল থেকে পাহাড়ে সরে গিয়ে নিজেদের পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে পারে। অর্থাৎ উপকূলীয় এলাকা দখল করলেই হুথিদের সামরিক সক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে, এমন নয়। পাহাড়ে তাদের অবস্থান অক্ষুণ্ন থাকলে তারা পরবর্তী সময়ে আবার উপকূলের দিকে ফিরে আসতে পারে।
ইয়েমেনের দুর্গম ভূপ্রকৃতি দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, পাহাড়ি এলাকা হুথিদের চলাচল আড়াল করা এবং সামরিক অবস্থান ধরে রাখার সুযোগ দেয়। আল-এরিয়ানি বলেন, উপকূলের সমান্তরালে থাকা গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ের চূড়াগুলো নিয়ন্ত্রণে না আনলে উপকূলও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। তার ভাষায়, উপকূল নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রথমে তার ওপর আধিপত্য বিস্তারকারী পাহাড়ি অবস্থানগুলো নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে।
এ কারণে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি বড় ধরনের স্থল অভিযান চালানোর পরিবর্তে তাদের সামরিক সক্ষমতা সীমিত করা এবং নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশলই আপাতত বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। এই পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতির কারণে। বিভিন্ন সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে ইয়েমেনের মোখা ও বাব আল-মান্দেবের কাছাকাছি অবস্থানগুলোর ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বৃদ্ধির কথা তুলে ধরা হয়েছে।
বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। ফলে এর আশপাশের উপকূল ও পাহাড়ি অবস্থানগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর চাপ তৈরির সক্ষমতা বাড়তে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে হুথিরা সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজ ও অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। একই সময়ে সৌদি আরবও ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রগতি ঠেকাতে সীমিত সামরিক পদক্ষেপ ও কূটনৈতিক বিকল্পের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে।
ইয়াসমিন আল-এরিয়ানির বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো- হুথিদের পুরোপুরি সামরিকভাবে পরাজিত করার চেয়ে তাদের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়তো বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হতে পারে। কারণ পাহাড়ি ঘাঁটি, দুর্গম ভূখণ্ড এবং উপকূলের সঙ্গে পাহাড়ের ভৌগোলিক সম্পর্ক হুথিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক সুবিধা দেয়। ফলে কোনো বাহিনী যদি শুধু শহর বা উপকূলীয় এলাকা দখল করে, কিন্তু পেছনের উচ্চভূমি নিয়ন্ত্রণে নিতে না পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
ইয়েমেনের বর্তমান সংঘাতে তাই শুধু অস্ত্র, বিমান হামলা বা সেনা মোতায়েন নয়; ভূপ্রকৃতিও একটি বড় সামরিক উপাদান হয়ে উঠেছে। আর সেই কারণেই হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন করে পূর্ণমাত্রার স্থলযুদ্ধ শুরু করলে দ্রুত সামরিক ফল পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।