ইয়েমেনে সৌদি আরবের বিমান হামলার জবাবে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। একই সঙ্গে পবিত্র নগরী মক্কায় হামলার অভিযোগকে ‘মিথ্যা প্রচারণা’ বলে দাবি করেছে তারা।
হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারিয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি রাজধানী রিয়াদ ও পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ইয়ানবুতে দুটি পৃথক সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। রিয়াদের ‘সংবেদনশীল স্থাপনা’ এবং ইয়ানবুতে সৌদি তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনা ছিল হামলার লক্ষ্য।
হুথিদের দাবি, সৌদি আরবের ইয়েমেনবিরোধী বিমান অভিযান অব্যাহত থাকায় তারা ‘বদলে পাল্টা বৃদ্ধি’ নীতি অনুসরণ করছে। সাম্প্রতিক হামলায় কয়েক মাস পর আবার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবিও করেছে গোষ্ঠীটি।
হুথিদের হামলার দাবির কয়েক ঘণ্টা আগে রিয়াদে বিমান হামলার সতর্কতা জারি করে সৌদি কর্তৃপক্ষ। রাজধানীতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে কালো ধোঁয়ার বড় কুণ্ডলী দেখা যায়।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি বলেন, রিয়াদের দিকে ছোড়া একটি হুথি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। বায়েশ, তায়েফ, ফারাসান ও ইয়ানবুতেও হামলার চেষ্টা প্রতিহত করার দাবি করেছে সৌদি পক্ষ। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
তবে হুথিরা দাবি করেছে, রিয়াদ ও ইয়ানবুর লক্ষ্যবস্তুতে তাদের অভিযান সফল হয়েছে। এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মক্কা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
সৌদি আরব সম্প্রতি অভিযোগ করেছে, হুথিরা পবিত্র নগরী মক্কাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার চেষ্টা করেছে। হুথিরা ওই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে একে ‘পুরোনো মিথ্যা’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
হুথি নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি বলেছেন, এমন অভিযোগের জন্য সৌদি আরবকে জবাবদিহির মুখোমুখি করা হবে। হুথিদের সামরিক মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ওই অভিযোগ এবং ইয়েমেনে সৌদি হামলারও জবাব।
সৌদি পক্ষ অবশ্য হুথিদের বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামো লক্ষ্য করার অভিযোগ তুলেছে। ফলে মক্কাকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও দুই পক্ষের চলমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়েছে।
আরামকো কেন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য?
সাম্প্রতিক হামলায় ইয়ানবুর আরামকো স্থাপনা লক্ষ্য করার দাবি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। ইয়ানবু সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরীয় তেল ও শিল্পকেন্দ্র। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র থেকে পশ্চিম উপকূলে তেল সরবরাহের অবকাঠামোর সঙ্গে এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ রয়েছে।
এরই মধ্যে হুথিদের সৌদি তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ তৈরি করেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি তেল অবকাঠামোয় হুথি হামলা নিয়ে চীন ইরানের কাছে হামলা কমানোর অনুরোধ জানিয়েছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০৪ ডলারের ওপরে ছিল।
সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতির পর সৌদি আরব ও গোষ্ঠীটির মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। হুথিরা লোহিত সাগর উপকূলের বিভিন্ন এলাকা দখলে নেওয়ার পর বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি তাদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর ইয়েমেনে এক লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
ফলে মক্কা নিয়ে অভিযোগ, রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং আরামকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোকে লক্ষ্য করার দাবি—সব মিলিয়ে সৌদি-হুথি সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। উভয় পক্ষই পাল্টা পদক্ষেপের কথা বলায় আগামী দিনগুলোতে উত্তেজনা আরও বাড়ে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।