ইন্দোনেশিয়ার লম্বক দ্বীপের একটি ইসলামি আবাসিক বিদ্যালয়ে যৌন নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দুই সাবেক শিক্ষার্থী জিয়াদাতুর রাহমাহ, যিনি জিয়া নামে পরিচিত এবং ইউস্রন আজ্জাহিদি। অভিযোগের তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহের সেই লড়াই ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্কেও নতুন মাত্রা যোগ করে। শেষ পর্যন্ত গত মাসে তারা বিয়ে করেছেন।
বিবিসি আই ইনভেস্টিগেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুজনই লম্বকের আবু বারোকাত ইসলামি আবাসিক বিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। পড়াশোনা শেষে ইউস্রন জাকার্তায় এবং জিয়া মিসরের কায়রোতে চলে যান। পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে একসময় জিয়া ইউস্রনকে জানান, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আহমাদ ইমানুদ্দিন সুমার শিক্ষার্থীদের কাছে ‘আবাহ’ নামে পরিচিত তাকে ১৬ বছর বয়সে যৌন নির্যাতন করেছিলেন বলে তার অভিযোগ।
জিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, ক্লাস চলাকালে টয়লেটে যাওয়ার সময় প্রধান শিক্ষক তাকে বিদ্যালয় চত্বরে নিজের বাড়িতে যেতে বলেন। সেখানে তিনি জিয়ার প্রতি যৌন আচরণ করেন বলে অভিযোগ করেন জিয়া। ঘটনার পর তিনি নিজেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অনুভব করেছিলেন বলে বিবিসিকে জানান।
জিয়ার বক্তব্য শোনার পর ইউস্রন প্রথমে দ্বিধায় পড়ে যান। বিদ্যালয়ে তারা ছোটবেলা থেকেই কর্তৃপক্ষের কথা মেনে চলার সংস্কৃতিতে বড় হয়েছেন। কিন্তু অভিযোগটি তার মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে।
এরপর জিয়া, ইউস্রন এবং তাদের কয়েকজন সাবেক সহপাঠী মিলে অন্যান্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন বক্তব্য ও তথ্য একে অপরের সঙ্গে ভাগ করতে থাকেন। এভাবে আরও কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীর অভিযোগ সামনে আসে।
তাদের সংগ্রহ করা তথ্যের মধ্যে সুন্মা রোহানার অভিযোগও ছিল। তিনি বিবিসিকে জানান, ১৭ বছর বয়সে প্রধান শিক্ষক তাকে নববর্ষের নামাজের কথা বলে নিজের বাড়িতে ডেকেছিলেন। সেখানে তাকে যৌন নির্যাতনের চেষ্টা করা হয় বলে তার অভিযোগ। তিনি পালিয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন বলে জানান।
বিবিসির অনুসন্ধান অনুযায়ী, অভিযোগগুলো নিয়ে ইউস্রন তদন্ত চালানোর সময় তার ওপরও চাপ তৈরি হয়। প্রধান শিক্ষক তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং অভিযোগগুলো নিয়ে নীরব থাকার আহ্বান জানান বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এক পর্যায়ে ইউস্রন প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে ফোনে কথোপকথন রেকর্ড করেন। বিবিসি জানিয়েছে, ওই রেকর্ডিংয়ে অভিযোগকারীদের বিষয় নিয়ে নীরব থাকার জন্য চাপ দেওয়ার কথোপকথন রয়েছে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিবিসি প্রধান শিক্ষক আহমাদ ইমানুদ্দিন সুমার ও সংশ্লিষ্ট আরেক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা কোনো জবাব দেননি। বিদ্যালয় পরিচালনাকারী সংগঠন NWDI অবশ্য বলেছে, তারা অভিযোগগুলো অভ্যন্তরীণভাবে তদন্ত করছে এবং যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
সুন্মা গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। তবে বিবিসির প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তার মামলায় পুলিশের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষা চলছিল এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি এখনও দায়িত্বে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সুন্মা বিবিসিকে বলেন, তিনি চান না তার সঙ্গে যা ঘটেছে, তা অন্য কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে ঘটুক। তাই তিনি ন্যায়বিচার চান।
এই তদন্ত ও অভিযোগের প্রক্রিয়ার মধ্যেই জিয়া ও ইউস্রনের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। তিন বছর ধরে তারা নিয়মিত যোগাযোগ করছিলেন। ইউস্রন পরে কায়রোতে জিয়ার কাছে চলে যান।
ইউস্রনের ভাষ্য অনুযায়ী, জিয়ার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তিনি স্বস্তি অনুভব করেন। জিয়াও জানান, ইউস্রন তার জন্য মিসরে আসায় তার প্রতি আস্থা আরও দৃঢ় হয়। তাদের সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল পারস্পরিক বিশ্বাস এবং কঠিন সময়ের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে।
তাদের আইনজীবী জোকো জুমাদি বলেন, শিক্ষার্থীদের সাহস এবং প্রমাণ সংগ্রহের পদ্ধতি তাকে মুগ্ধ করেছে। বিশেষ করে গোপনে ধারণ করা কথোপকথনগুলো অভিযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
আইনজীবী জোকো ও তার দল গত তিন বছরে পশ্চিম নুসা তেংগারা প্রদেশের ইসলামি আবাসিক বিদ্যালয়গুলোকে ঘিরে যৌন নির্যাতনের ২০টি মামলা নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর মতে, এগুলো সমস্যাটির একটি ছোট অংশ মাত্র।
বিবিসি জানিয়েছে, তাদের পূর্ণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘World of Secrets: Catching My Teacher’ শিরোনামে প্রকাশিত হচ্ছে। প্রতিবেদনে যৌন নির্যাতনের অভিযোগগুলোর পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
সূত্র: বিবিসি