বর্তমান বিশ্বের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে যেন অনেকটাই ঐকমত্য রয়েছে বিশ্ব এখন গভীর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান দুটি যুদ্ধ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, বৈশ্বিক অর্থনীতি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যও দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
এমন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দিতে জড়ো হচ্ছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবারের বৈশ্বিক পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।
ইউরোপে চলমান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এসব সংঘাত শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে না, বরং জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।
এর পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাণিজ্যনীতি, জ্বালানি বাজার, নিষেধাজ্ঞা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সব মিলিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকারকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে।
পরিবর্তন ঘটছে বিশ্বব্যবস্থাতেও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক কূটনীতি গড়ে উঠেছিল, সেটি বর্তমানে নানা চাপের মুখে। বড় শক্তিগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য এবং বিভিন্ন সংঘাতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্নও বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশন শুধু রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়মিত বার্ষিক বৈঠক হিসেবে দেখা হচ্ছে না। যুদ্ধ বন্ধ, সংঘাত কমানো, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পুনরুদ্ধার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক মঞ্চ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বনেতাদের সামনে তাই একাধিক সংকট একসঙ্গে মোকাবিলার প্রশ্ন রয়েছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে তাদের অবস্থান তুলে ধরতে হবে।
জাতিসংঘের অধিবেশন চলাকালে বিভিন্ন দেশের নেতাদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকও অনুষ্ঠিত হবে। এসব আলোচনায় যুদ্ধ ও সংঘাতের পাশাপাশি সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধান, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সব মিলিয়ে এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এমন এক সময়ে শুরু হচ্ছে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সংকট পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বদলে যাওয়া আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের এই সময়ে কূটনীতিকদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বিভক্ত বিশ্বে দেশগুলো কতটা ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারবে এবং জাতিসংঘ সেই ঐকমত্য তৈরিতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।