গাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববাসীর লজ্জিত হওয়া উচিত: ম্যাক্রোঁ 

গাজায় চলমান মানবিক সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তিনি বলেছেন, গাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববাসীর লজ্জিত হওয়া উচিত এবং শুধু শান্তির কথা বললেই হবে না, বাস্তব পদক্ষেপও নিতে হবে।

একই সময়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের(ইউএনএজি) অধিবেশনে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে যুক্তরাজ্য ও কানাডা। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ফিলিস্তিনিদের জন্য ১০ কোটি কানাডীয় ডলার বা প্রায় ৭ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন।

জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে ম্যাক্রোঁ প্রশ্ন তোলেন, গাজার পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি নিষ্ক্রিয় থাকে, তাহলে বিশ্বব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় থাকে। তিনি বলেন, ফ্রান্স এক বছর আগেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর তালিকায় যোগ দিয়েছিল। কিন্তু স্বীকৃতির পাশাপাশি গাজায় মানবিক পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন বলেও তিনি জোর দেন। ম্যাক্রোঁ একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ও সেখানে চলমান পরিস্থিতির সমালোচনা করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এমন কর্মকাণ্ড দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে আরও কঠিন করে তুলছে।

ফ্রান্সসহ কানাডা, যুক্তরাজ্য ও আরও কয়েকটি দেশ সম্প্রতি পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য সীমিত করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ১২ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যৌথ বিবৃতিতে বলেন, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে যুক্তরাজ্য
জাতিসংঘে বক্তব্যে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেন, কয়েক দশক ধরে বিশ্বনেতারা দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথা বলে আসছেন। এখন সেই বক্তব্যকে বাস্তব পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত না করা হলে আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা আরও কমবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, গাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু এবং পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা না পৌঁছানোর বিষয়টি আর উপেক্ষা করা যায় না।

একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য ইসরায়েলের নিরাপত্তার বিষয়টি স্বীকার করলেও গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সরকারের কর্মকাণ্ডকে হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার যুক্তি দিয়ে বৈধতা দেওয়া যায় না বলে অবস্থান জানায়। যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্যের বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ নিয়েছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জাতিসংঘে ঘোষণা দিয়েছেন, ফিলিস্তিনিদের জন্য ১০ কোটি কানাডীয় ডলার সহায়তা দেওয়া হবে। এর ৮০ শতাংশ সরাসরি মানবিক সহায়তায় এবং বাকি ২০ শতাংশ শান্তি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কার্যক্রমে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য কানাডার বহুবছরের একটি উদ্যোগও রয়েছে। কার্নি বলেন, গাজার ফিলিস্তিনিরা ব্যাপক মানবিক দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলিদের জন্য হামাস ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হুমকির কথাও উল্লেখ করেন। কানাডা আরও জানিয়েছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান নিয়ে নতুন চাপ
ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডার অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে গাজা ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম প্রধান আলোচ্য হয়ে উঠেছে। ফ্রান্স, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ ১২টি দেশ সেপ্টেম্বরের শুরুতে এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছিল, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং ভূমি সংযুক্তির মতো পদক্ষেপ দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একই বিবৃতিতে তারা ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থের স্বীকৃতি এবং হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার নিন্দাও পুনর্ব্যক্ত করে।

এদিকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন গত কয়েক বছরে বেড়েছে। তবে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেলেই ফিলিস্তিনের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডের সুনির্দিষ্ট সীমা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিংবা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সমাধান হয়ে যায় না। এসব প্রশ্ন নিয়ে এখনো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মতপার্থক্য রয়েছে।

সামনে কূটনৈতিক চাপ কতটা বাড়বে?
জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে পশ্চিমা কয়েকটি দেশের অবস্থানের পরিবর্তন ফিলিস্তিন প্রশ্নে কূটনৈতিক আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিশেষ করে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো দেশগুলো একদিকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও হামাসের হামলার নিন্দার বিষয়টিও তাদের বক্তব্যে রাখছে। তবে এসব কূটনৈতিক অবস্থান গাজায় যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের বাস্তব পরিস্থিতিতে কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী সময়ে দেশগুলোর ঘোষিত নীতি কতটা বাস্তবায়িত হয় এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগ কীভাবে এগোয় তার ওপর।

জাতিসংঘের মঞ্চে এখন তাই শুধু ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির প্রশ্ন নয়- গাজায় মানবিক সহায়তা, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ দুই রাষ্ট্রভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামো সবগুলো বিষয়ই একই কূটনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।