ট্রাম্পের ছেলের কোম্পানি থেকে ড্রোন কিনছে ভারত-পাকিস্তান!

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই ছেলে সমর্থিত একটি মার্কিন ড্রোন কোম্পানির সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় যাচ্ছে পাকিস্তান। তবে কোম্পানিটির ভারতের বাজারে কার্যক্রম এবং এর এক সহপ্রতিষ্ঠাতার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীতে কাজ করার অতীত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পাওয়ারাস (Powerus)-এর একটি প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে রাওয়ালপিন্ডিতে সেনা সদর দপ্তরে বৈঠক করে। এর এক দিন পর কোম্পানিটি জানায়, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তারা মানববিহীন আকাশযান বা UAS (Unmanned Aerial Systems) সরবরাহের জন্য একটি ‘সীমিত ক্রয়াদেশ’ পেয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাদা একটি সমঝোতা স্মারক বা MoU সই করার কথাও জানায় প্রতিষ্ঠানটি।

তবে ক্রয়াদেশটির আর্থিক মূল্য কত এবং ঠিক কোন ধরনের ড্রোন বা ড্রোন-প্রযুক্তি পাকিস্তান কিনছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু চুক্তির খবর প্রকাশের পর পাকিস্তানের ড্রোন সক্ষমতা নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের মধ্যে আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ, মাত্র তিন মাসেরও কম সময় আগে একই কোম্পানি ভারতের একটি প্রতিরক্ষা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে তাদের ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি ভারতে উৎপাদন ও বিক্রির একচেটিয়া অধিকার দিয়েছিল।

এর পাশাপাশি পাওয়ারাসের একজন সহপ্রতিষ্ঠাতা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীতে কাজ করেছেন বলেও তথ্য সামনে এসেছে। পাকিস্তান ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না এবং গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে আসছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে- যে পাকিস্তান নিজেই ড্রোন তৈরি করে এবং চীন ও তুরস্কের কাছ থেকেও বিভিন্ন ধরনের ড্রোন ও প্রযুক্তি সংগ্রহ করে, তারা কেন মাত্র এক বছর আগে প্রতিষ্ঠিত একটি মার্কিন কোম্পানির দিকে ঝুঁকছে? বিশেষ করে সেই কোম্পানির ভারতের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে এর একজন সহপ্রতিষ্ঠাতার অতীত থাকার বিষয়টি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা নীতির সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

পাকিস্তানের প্রয়োজন কোথায়?
টরন্টোভিত্তিক প্রতিরক্ষা সংবাদ ও বাজার বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্ম Quwa Group-এর প্রতিষ্ঠাতা বিলাল খান মনে করেন, পাকিস্তানের নিজস্ব সক্ষমতার কারণে পাওয়ারাসের প্রযুক্তি দীর্ঘমেয়াদে কোথায় জায়গা করে নেবে, তা স্পষ্ট নয়। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, পাকিস্তান প্রযুক্তিগতভাবে পাওয়ারাস প্রদর্শন করা ড্রোনগুলোর প্রত্যেকটি ইতোমধ্যে তৈরি করে অথবা তৈরির সক্ষমতা রাখে। ফলে পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ থেকে দীর্ঘমেয়াদে পাওয়ারাস কোথায় অবস্থান করবে, সেটি পরিষ্কার নয়।

এই মন্তব্য পাকিস্তানের সামরিক ড্রোন সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। দেশটি গত কয়েক বছরে নিজস্ব মানববিহীন বিমান প্রযুক্তির উন্নয়নে জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে চীন ও তুরস্কের কাছ থেকেও বিভিন্ন ধরনের ড্রোন ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি সংগ্রহ করেছে। বিশেষ করে নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং আক্রমণ সক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন পাকিস্তানের সামরিক ব্যবস্থায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই নতুন কোনো বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে, পাওয়ারাস এমন কী প্রযুক্তি দিচ্ছে, যা পাকিস্তানের বর্তমান সক্ষমতা বা চীন-তুরস্ক থেকে পাওয়া প্রযুক্তির বাইরে অতিরিক্ত সুবিধা দিতে পারে?

ভারতের সঙ্গে একই কোম্পানির সম্পর্ক
পাকিস্তানের জন্য বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়েছে পাওয়ারাসের ভারতের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের কারণে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তির মাত্র কয়েক মাস আগে পাওয়ারাস ভারতের একটি প্রতিরক্ষা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে তাদের ড্রোন ইন্টারসেপ্টর প্রযুক্তি ভারতে উৎপাদন ও বাজারজাত করার একচেটিয়া অধিকার দেয়।

ড্রোন যুদ্ধের বর্তমান বাস্তবতায় ‘ড্রোন ইন্টারসেপ্টর’ প্রযুক্তির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। একদিকে সামরিক বাহিনী নজরদারি ও আক্রমণের জন্য ড্রোন ব্যবহার করছে, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের ড্রোন শনাক্ত, অনুসরণ ও ধ্বংস করার জন্য পাল্টা-ড্রোন প্রযুক্তিও উন্নত করা হচ্ছে। ফলে একই কোম্পানির প্রযুক্তি ভারতের বাজারে এবং পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রবেশ করলে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, তথ্যের গোপনীয়তা ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।