পরমাণু কর্মসূচিতে নমনীয়তার ইঙ্গিত

পেজেশকিয়ান-আরাগচি কী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আঁতাত করে ফেললো!

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহ এবং পরমাণু কর্মসূচিতে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত দেওয়ার পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছেন দেশটির কট্টরপন্থীরা।

ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমানো, ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতকে আরও কম সমৃদ্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে প্রস্তুত থাকতে পারে।

এর এক দিন আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া পেজেশকিয়ানের বক্তব্য ইরানের রক্ষণশীল রাজনৈতিক মহলের অনেকেই স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু ফক্স নিউজে তাঁর মন্তব্য প্রকাশের পর কট্টরপন্থীদের একটি অংশ তীব্র সমালোচনা শুরু করে।

পেজেশকিয়ান আরও বলেন, নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায় তেহরান। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার কোনো পরিকল্পনা ইরানের নেই বলেও জানান।

পেজেশকিয়ানের অবস্থানের সমালোচনা করে কট্টরপন্থী কর্মী মোহাম্মদ-হোসেইন চাভোশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, পরমাণু ও ইউরেনিয়াম ইস্যুতে ‘অর্থহীন কথা’ না বলতে প্রেসিডেন্টকে সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, পেজেশকিয়ান সত্য কথা বললে তাঁরা তাঁকে সমর্থন করবেন। তবে তিনি সীমা অতিক্রম করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এমন হুমকিও দেন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, পরমাণু ইস্যুতে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

তবে পেজেশকিয়ানের অবস্থানের পক্ষে ইরানের ভেতরেও মত রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক ব্যবহারকারী প্রশ্ন তোলেন, প্রেসিডেন্ট কি আদৌ পরমাণু কর্মসূচি পরিত্যাগের কথা বলেছেন?

ওই ব্যবহারকারীর বক্তব্য, পেজেশকিয়ান ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণের বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। যুদ্ধ, অবরোধ ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দেশকে আটকে রাখার পরিবর্তে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

শুধু প্রেসিডেন্ট নন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও কট্টরপন্থীদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় আরাগচি জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটিতে এক সপ্তাহের একটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা রয়েছে।

আরাগচির ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন সম্মত হলে ইরান দ্রুত পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন শুরু করতে প্রস্তুত। সাত দিনের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং এরপর পরমাণু ইস্যুসহ বৃহত্তর কোনো চুক্তি নিয়ে সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনা শুরু করার কাঠামো রয়েছে প্রস্তাবে।

আরাগচি আরও জানান, প্রস্তাবটির একটি শর্ত হলো হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে হওয়া একটি ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই শনিবার টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে নিশ্চিত করেছেন, নিউইয়র্কে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের শর্তগুলো তুলে ধরার জন্য আরাগচিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

তারপরও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। কট্টরপন্থী সংসদ সদস্য আমির-হোসেইন সাবেতি জানিয়েছেন, তিনি আরাগচির বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব সংসদীয় ব্যবস্থায় জমা দিয়েছেন।

একদিকে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাব্য পথ তৈরি করছে, অন্যদিকে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক মহল যুক্তরাষ্ট্রের চাপ অব্যাহত থাকলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে সতর্ক করছে।

মাশহাদের জুমার নামাজের খতিব আহমাদ আলামোলহোদা শুক্রবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে ইরানের হাতে নতুন অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এমনকি মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলার ভৌগোলিক পরিসর ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত করার সক্ষমতার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বিও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে ইরান সংঘাতের ‘ভূগোল পরিবর্তন’, নতুন অস্ত্র ও সরঞ্জাম ব্যবহার এবং ভিন্ন লক্ষ্যবস্তু বেছে নেওয়ার মাধ্যমে জবাব দিতে পারে।

এসব বক্তব্যের পাশাপাশি আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতিও ইরানের সতর্কবার্তা জোরালো হচ্ছে।

ইরানি বিমান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ কঠোর হওয়ার মধ্যে শুক্রবার ইরানের নাজাফগামী ফ্লাইটও বাতিল করা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিকভাবে ইরানের অবশিষ্ট বিমান যোগাযোগ আরও সংকুচিত হয়েছে।

এর আগে রেজাই সতর্ক করে বলেছিলেন, কোনো আঞ্চলিক দেশ যদি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানি বিমানকে নিজেদের বিমানবন্দর ব্যবহারে বাধা দেয়, তাহলে সেই দেশগুলোর বিমানও ইরানের বিমানবন্দর ব্যবহারের সুযোগ হারাতে পারে।

সুপ্রিম নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা ও সহযোগী মোহাম্মদ মোখবের শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও কঠোর ভাষায় বলেন, আঞ্চলিক দেশগুলোর বিমান চলাচলের সুযোগ হয় সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, নয়তো কারও জন্য থাকবে না।

তাঁর বক্তব্য, ইরানি বিমান যদি উড়তে এবং বিমানবন্দর সেবা নিতে না পারে, তাহলে অঞ্চলটির কোনো দেশের বিমানও একই সুবিধা পাবে না।

তেহরানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে তাই দুটি ভিন্ন প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য কী ধরনের ছাড়, শর্ত ও ধাপে সমঝোতা সম্ভব তার একটি কাঠামো তুলে ধরছেন।

অন্যদিকে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অঙ্গনের কট্টরপন্থীরা পরমাণু কর্মসূচিতে ছাড়ের বিরোধিতা করছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত আরও বিস্তৃত করার সক্ষমতার কথা তুলে ধরছেন।

ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ পুনরায় সক্রিয় হওয়ার মধ্যেই ইরানের অভ্যন্তরে সমঝোতার শর্ত ও সীমা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হচ্ছে। সামনে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা এগোলে প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ দুই দিকই সামলাতে হবে।