পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবই তাহলে মানছে পেজেশকিয়ান?

ইরানের পরমাণু কর্মসূচিতে নির্দিষ্ট সীমা আরোপের বিষয়ে আলোচনায় বসতে তেহরান প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT)-এর কাঠামোর মধ্যেই এ বিষয়ে সমঝোতা করা সম্ভব।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান এ কথা বলেন। একই সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানে আন্তর্জাতিক পরমাণু পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার বিষয়েও ইতিবাচক অবস্থান জানান।

সাক্ষাৎকারে উপস্থাপক মার্গারেট ব্রেনান জানতে চান, ইরান কি তার পরমাণু কর্মসূচিতে সীমা আরোপের বিষয়ে নতুন করে আলোচনা করতে রাজি? জবাবে পেজেশকিয়ান বলেন, আগের আলোচনাতেও এ বিষয়ে সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছিল দুই পক্ষ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, NPT ও বিদ্যমান আন্তর্জাতিক কাঠামোর আওতায় এসব বিষয় নিয়ে চুক্তি করা সম্ভব।

ইরানে জাতিসংঘের পরমাণু পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘অবশ্যই।’

তিনি জানান, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর আওতায় পরিদর্শন নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সমঝোতা করা যেতে পারে। তবে তিনি একই সঙ্গে দাবি করেন, আগের সময়ে ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে হামলার পর তেহরানের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।

পেজেশকিয়ানের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন করে পরিদর্শনের বিষয়টি আলোচনার অংশ হিসেবেই নির্ধারণ করা যেতে পারে।

IAEA অতীতে ইরানের কিছু পরমাণু স্থাপনায় পূর্ণ প্রবেশাধিকার না পাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। ফলে ইরানের নতুন এই অবস্থান ভবিষ্যৎ পরমাণু আলোচনায় পরিদর্শন ও যাচাইব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য করে তুলতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে ‘অবিশ্বাসের পরিবেশ’ তৈরি হয়েছে।

পেজেশকিয়ানের ভাষ্য, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একাধিক দফা আলোচনা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে লিখিত সমঝোতাও হয়েছিল। কিন্তু ইরানের অভিযোগ, আলোচনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এ কারণে তেহরান নতুন কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর আগে যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবে পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা মানবে, তা নিশ্চিত হতে চায়।

তিনি বলেন, আলোচনায় বসার আগে ঠিক কী বিষয়ে সমঝোতা করা হবে, সেটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। লিখিত চুক্তি বা সমঝোতা বাস্তবায়নের বিষয়ে বিশ্বাস তৈরি না হলে সরাসরি বৈঠক করাও কঠিন।

অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইরানের পরমাণু অস্ত্র অর্জন ঠেকানোর বিষয়ে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। একই সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

ইরানের পরমাণু কর্মসূচির অন্যতম বিতর্কিত বিষয় হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। অন্যদিকে তেহরান দাবি করে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের অধিকার আন্তর্জাতিক আইন ও NPT-এর আওতায় তাদের রয়েছে।

পেজেশকিয়ান সাক্ষাৎকারে আবারও বলেন, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না। তাঁর দাবি, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও পরমাণু অস্ত্র তৈরি নিষিদ্ধ।

তবে আলোচনায় ইরানের সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা, মজুত ইউরেনিয়াম, পরিদর্শন ও যাচাইব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার সীমা এসব বিষয়ই বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে।

আলোচনার দরজা খোলা, কিন্তু শর্তও রয়েছে

পেজেশকিয়ানের সর্বশেষ বক্তব্যে একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার দরজা খোলা রাখার ইঙ্গিত রয়েছে, অন্যদিকে তেহরানের প্রধান উদ্বেগও স্পষ্ট হয়েছে বিশ্বাসযোগ্যতা ও চুক্তি বাস্তবায়ন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ২৩ সেপ্টেম্বর দেওয়া ভাষণেও পেজেশকিয়ান বলেছিলেন, ইরান সংলাপ ও আলোচনার জন্য প্রস্তুত, তবে হুমকি বা সামরিক চাপের অধীনে কোনো আলোচনা গ্রহণ করবে না।

ফলে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলেও পরমাণু কর্মসূচির সীমা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন, নিষেধাজ্ঞা এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানের পার্থক্য এখনো বড়। পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে আলোচনার আগ্রহ স্পষ্ট হলেও চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য দুই পক্ষকে এসব প্রশ্নে বাস্তবসম্মত সমাধানে পৌঁছাতে হবে।