জাতিসংঘে মুখোমুখি ভারত-পাকিস্তান, উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের বক্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছে ভারত।

জাতিসংঘে ভারতের প্রথম সচিব পেটাল গেহলট ‘রাইট অব রিপ্লাই’ ব্যবহার করে পাকিস্তানের বক্তব্যকে ‘অদ্ভুত’ বলে আখ্যায়িত করেন। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ, কাশ্মীর, মানবাধিকার ও ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাত নিয়ে ইসলামাবাদের বক্তব্যের পাল্টা ব্যাখ্যা তুলে ধরেন তিনি।

ভারতের প্রতিনিধি বলেন, পাকিস্তান একদিকে নিরাপত্তা রক্ষার কথা বলে, অন্যদিকে ভারতের অভিযোগ অনুযায়ী সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, পাকিস্তান থেকে সন্ত্রাসবাদ অব্যাহত থাকলে তার ‘পরিণতি’ হবে।

পেটাল গেহলট বলেন, ‘আমরা গত বছর দেখিয়েছি, সন্ত্রাসীদের পালানোর বা লুকিয়ে থাকার কোনো জায়গা থাকবে না। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার ভারত প্রয়োগ করবে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সন্ত্রাস অব্যাহত থাকলে তার পরিণতি হবে।’

ভারতের প্রতিনিধি পাকিস্তানের মাটিতে আল-কায়েদার সাবেক নেতা ও ৯/১১ হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ওসামা বিন লাদেনের অবস্থানের বিষয়টি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ৯/১১ হামলার বার্ষিকী পালন করেছে। ওই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণকেন্দ্রের কাছেই বসবাস করছিলেন—এমন মন্তব্য করেন তিনি।

বিন লাদেন ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন অভিযানে নিহত হন। ভারতের বক্তব্যে এই ঘটনাকে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে প্রশ্ন তোলার একটি উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

এর আগে শুক্রবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া প্রায় ২৩ মিনিটের ভাষণে শেহবাজ শরিফ ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ওই সংঘাতের সময় ‘সময়োপযোগী হস্তক্ষেপের’ জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।

শেহবাজের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ যখন বড় ধরনের সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে ছিল, তখন ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন এবং বলেন, ওই হস্তক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ায় বড় ধরনের প্রাণহানি ঠেকাতে সহায়ক হয়েছে।

তবে ভারত বরাবরই ২০২৫ সালের সংঘাত থামাতে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ভারতের বক্তব্য, যুদ্ধবিরতি বা সংঘাত থামানোর বিষয়ে কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ছিল না।

জাতিসংঘে শেহবাজ শরিফ কাশ্মীর ইস্যুও উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়াকে আবার ২০২৫ সালের মতো সংঘাতের প্রান্তে পৌঁছানো থেকে ঠেকাতে কাশ্মীর সমস্যার একটি ‘ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য’ সমাধান প্রয়োজন।

এর জবাবে ভারতের প্রতিনিধি জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতের ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

পেটাল গেহলট বলেন, পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের রাওয়ালাকোটের মানুষের কাছে পাকিস্তান সরকারের কথিত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে চাওয়া উচিত।

এ সময় ভারত পাকিস্তানের মানবাধিকার ও গণতন্ত্রবিষয়ক বক্তব্যেরও সমালোচনা করে।

ভারতের প্রতিনিধি পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তিত হলেও সেনাবাহিনীর প্রভাব অব্যাহত থাকে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে।

তিনি পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর প্রভাব রয়েছে বলে ভারত মনে করে।

ধর্মীয় সহনশীলতার প্রসঙ্গেও পাকিস্তানের বক্তব্যের সমালোচনা করে ভারত দেশটির সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি এবং ব্লাসফেমি আইনের প্রয়োগের বিষয়টি সামনে আনে।

শেহবাজ শরিফের ভাষণে সিন্ধু পানি চুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত পানি আটকে দেওয়া, বাধাগ্রস্ত করা বা অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টাকে ইসলামাবাদ ‘যুদ্ধের পদক্ষেপ’ হিসেবে বিবেচনা করবে।

পাকিস্তানের সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, সিন্ধু নদব্যবস্থা দেশটির অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই পানি নিয়ে কোনো ধরনের একতরফা পদক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না বলে শেহবাজ জানান।

অন্যদিকে, ভারত ২০২৫ সালের পহেলগাম হামলার পর সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নেওয়া অন্যান্য পদক্ষেপের বিষয়টি যুক্ত করেছে। ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের অভিযোগ করে আসছে; পাকিস্তান এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে হামলায় ২৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হয়। ভারত ৭ মে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পাকিস্তান ও পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে কথিত সন্ত্রাসী অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথা জানায়। পাকিস্তান এ ঘটনাকে ভারতের আগ্রাসন হিসেবে বর্ণনা করে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের দাবি করে।

দুই দেশের বক্তব্যে সংঘাতের কারণ, সামরিক সাফল্য এবং যুদ্ধবিরতিতে তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে।

জাতিসংঘের মঞ্চে শেহবাজ শরিফের কাশ্মীর ও পানি ইস্যু উত্থাপন এবং ২০২৫ সালের সংঘাতের বর্ণনার পর ভারতের পাল্টা বক্তব্যে দুই দেশের পুরোনো বিরোধগুলো আবারও আন্তর্জাতিক কূটনীতির আলোচনায় উঠে এসেছে।

ভারত বলেছে, পাকিস্তানের বক্তব্যে ‘মিথ্যা’ বা বিভ্রান্তিকর দাবি বারবার তুলে ধরলে তা সত্যে পরিণত হবে না। অন্যদিকে পাকিস্তান তার ভাষণে কাশ্মীর, পানি ও ২০২৫ সালের সংঘাতের বিষয়ে নিজস্ব অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।

ফলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের মূল বিরোধগুলো—সন্ত্রাসবাদ, কাশ্মীর, পানি এবং ২০২৫ সালের সংঘাতের ব্যাখ্যা—আবারও দুই দেশের সরাসরি কূটনৈতিক বাকযুদ্ধের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।