জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণ চলাকালে সভাকক্ষে অবস্থান করায় ইরানের এক কূটনীতিককে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে তাকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও বরখাস্তের আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির এক এমপি।
ইরানের পার্লামেন্টের আর্টিকেল ৯০ কমিশনের উপপ্রধান হোসেইন আলী হাজি-দেলিগানি বলেছেন, জাতিসংঘে ইরানি মিশনের সদস্য নাসের আসাদিকে তার পদ থেকে অপসারণ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বরখাস্ত করা উচিত। তাঁর অভিযোগ, ট্রাম্পের ভাষণের সময় অন্য ইরানি কূটনীতিকরা সভাকক্ষ ত্যাগ করলেও আসাদি সেখানে অবস্থান করেন।
ইরানের সংবাদমাধ্যমভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ভাষণের সময় সভাকক্ষে থাকা ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে আসাদিই একমাত্র কূটনীতিক ছিলেন। হাজি-দেলিগানি এ ঘটনাকে সমালোচনা করে সংসদীয় তদারকি ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।
ট্রাম্প ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ইরান নিয়ে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি ইরানকে নতুন একটি চুক্তিতে রাজি হওয়ার আহ্বান জানান এবং চুক্তি না হলে দেশটির বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দেন।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই আসাদির অবস্থানের পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, জাতিসংঘে ইরানের আসনই তাদের একটি ‘প্রতিরক্ষা অবস্থান’ বা কূটনৈতিক ক্ষেত্র। কঠোর বক্তব্য বা অপমানের কারণে সেই জায়গা ছেড়ে দেওয়া ইরানের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়—এমন অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
পারমাণবিক প্রতিরোধের আহ্বান
হাজি-দেলিগানি একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক নীতি আরও কঠোর করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ইরান যেসব দেশকে শত্রু মনে করে তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে; তাই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরির জন্য ইরানেরও এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ইরানের পার্লামেন্টে এর আগেও পারমাণবিক অস্ত্রের সম্ভাবনা এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT) থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর হাজি-দেলিগানি পার্লামেন্টে দ্রুত বিবেচনার জন্য একটি প্রস্তাবের কথা জানান, যাতে ইরানের NPT থেকে প্রত্যাহারের বিষয়টি ছিল। তাঁর যুক্তি ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তিতে থাকা ইরানের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে ইরানের কয়েকজন কট্টরপন্থী রাজনীতিকও ‘পারমাণবিক প্রতিরোধ’ গড়ে তোলার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। তবে এসব বক্তব্যকে ইরানের আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যায় না। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে।
কূটনীতি বনাম কঠোর অবস্থান
জাতিসংঘে ইরানের অবস্থান নিয়ে এই বিতর্ক এমন সময়ে সামনে এলো, যখন তেহরান একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগের পথও পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জাতিসংঘের ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচনা করলেও আলোচনার দরজা খোলা রাখার ইঙ্গিত দেন। একই সময়ে ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু এবং সংঘাত কমানোর বিষয়ে সাত দিনের একটি পরিকল্পনাও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছানোর কথা জানানো হয়েছে।
ফলে নাসের আসাদিকে ঘিরে বিতর্কটি ইরানের অভ্যন্তরে চলমান একটি বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে এনেছে—ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে তেহরান কতটা কঠোর সামরিক অবস্থান নেবে এবং একই সঙ্গে জাতিসংঘ ও কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো কতটা সক্রিয় রাখবে।