ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় ইউরোপে জ্বালানির ‘দাম সংকট’: ইইউ

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) একটি ‘জ্বালানি মূল্য সংকটের’ মুখে পড়েছে বলে সতর্ক করেছেন ইউরোপীয় কমিশনের জ্বালানি কমিশনার ড্যান জর্গেনসেন।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ইইউভুক্ত দেশগুলোর জ্বালানিমন্ত্রীদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি দেশগুলোকে গ্যাস ও বিদ্যুতের চাহিদা কমানোর পাশাপাশি শীত মৌসুমের আগে গ্যাসের মজুত বাড়ানোর প্রস্তুতি জোরদার করার আহ্বান জানান। চিঠিটি রয়টার্স দেখেছে।

জর্গেনসেন বলেন, “আমরা এমন একটি মূল্য সংকটের মুখোমুখি, যার সঙ্গে সরবরাহ সংকটও যুক্ত।”

তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ২০২১ সালের শীতের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সে সময় রাশিয়া ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল। তবে এবার পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউরোপ আগের তুলনায় বেশি প্রস্তুত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

জর্গেনসেন ইইউ সদস্যদেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাসের মজুত বাড়ানোর কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর পদক্ষেপও বিবেচনা করতে হবে।

তিনি বলেন, “যতদিন প্রয়োজন, গ্যাসের মজুত বাড়ানো অথবা গ্যাস ও বিদ্যুতের চাহিদা কমিয়ে রাখার মতো পদক্ষেপ নেওয়া বা অব্যাহত রাখার বিষয়টি বিবেচনা করার আহ্বান জানাচ্ছি।”

ইউরোপের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ শীতকালে আবাসিক ও শিল্প খাতে গ্যাসের চাহিদা সাধারণত বেড়ে যায়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকুচিত হলে অতিরিক্ত দামের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

২০২১ সালে রাশিয়া ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার পর পরবর্তী সময়ে ইউরোপে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়। সেই অভিজ্ঞতার পর ইইউ গ্যাস সরবরাহের উৎস বহুমুখী করার পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

ইউরোপীয় কমিশন বলছে, বর্তমানে ইউরোপের জ্বালানি ব্যবস্থা আগের তুলনায় বেশি বৈচিত্র্যময়। এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরবরাহের উৎস বহুমুখীকরণ এবং গ্যাসের ব্যবহার কমে যাওয়ায় ইউরোপের প্রতিরোধক্ষমতাও বেড়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এখনো বড় উদ্বেগের কারণ।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিও ইউরোপের জ্বালানি বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এজেন্সি ফর দ্য কো-অপারেশন অব এনার্জি রেগুলেটরস (ACER) বলেছে, হরমুজের পরিস্থিতি ইউরোপের গ্যাস বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক এলএনজি রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাবিত করতে পারে।

কাতার ইউরোপের এলএনজি সরবরাহের অন্যতম উৎস। ফলে হরমুজ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হলে ইউরোপের গ্যাস বাজারে সরবরাহ ও দামের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।

রয়টার্স জানিয়েছে, হরমুজ সংকটের কারণে কাতারএনার্জির ভবিষ্যৎ এলএনজি সম্প্রসারণ প্রকল্পগুলোর কিছু অংশও বিলম্বের ঝুঁকিতে পড়েছে।

তবে ইইউর সতর্কবার্তার অর্থ এই নয় যে ইউরোপ এখনই গ্যাসের ঘাটতিতে পড়েছে।

৩ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় কমিশনের গ্যাস সমন্বয় গ্রুপ জানিয়েছিল, গ্যাসের মজুত আগের কয়েক বছরের তুলনায় কম হলেও তাৎক্ষণিক সরবরাহ-নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই। কমিশনের মতে, এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরবরাহের উৎস বহুমুখীকরণ এবং গ্যাসের চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে ইউরোপীয় ব্যবস্থা এখনো সামাল দেওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে।

২৫ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পরও কমিশন জানিয়েছে, আপাতত ইউরোপের গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল রয়েছে। তবে বৈশ্বিক বাজারের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

অর্থাৎ ইউরোপে বর্তমানে মূল উদ্বেগ তাৎক্ষণিক জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়া নয়, বরং সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও উচ্চমূল্য।

জ্বালানির দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিলেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, কৃষি এবং বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলোতে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে।

ইউরোপীয় কমিশন ইতোমধ্যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমাতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার ও জ্বালানি-নির্ভর শিল্পকে সহায়তা, গ্যাস মজুত সমন্বয় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থাপনা রয়েছে।

ইউরোপীয় কমিশনের জ্বালানি কমিশনার ড্যান জর্গেনসেনের সাম্প্রতিক চিঠির মূল বার্তা হলো—শীত আসার আগেই সম্ভাব্য সরবরাহ ও মূল্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে।

ইরান যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাসের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা যত দীর্ঘ হবে, ইউরোপের ওপর মূল্যচাপও তত বাড়তে পারে। তবে ইউরোপ ২০২১–২২ সালের অভিজ্ঞতা থেকে সরবরাহের উৎস বহুমুখীকরণ ও এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ করেছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং শীতের জন্য পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা।

অর্থাৎ ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন আর শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্র বা হরমুজ প্রণালিতে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রতিধ্বনি পৌঁছে গেছে ইউরোপের জ্বালানি বাজারেও—যেখানে যুদ্ধের সরাসরি সামরিক অভিঘাতের পাশাপাশি তেল-গ্যাসের মূল্য ও সরবরাহের ওপর চাপ নতুন অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে।

এমইউ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত