ইরানের ড্রোন সক্ষমতা বাড়াতে চীন ও রাশিয়ার সহায়তার নানা তথ্য সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দুই দেশের সহযোগিতার ধরন অবশ্য এক নয়। চীন মূলত দ্বৈত-ব্যবহারের প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ ও নেভিগেশন-সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও গোয়েন্দা-ভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার সহযোগিতার ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট তথ্য, ড্রোন প্রযুক্তি এবং ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে অর্জিত ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়টি সামনে এসেছে।
এর ফলে ইরানের ড্রোন কর্মসূচি শুধু দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল না থেকে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
চীনের ‘দ্বৈত-ব্যবহারের’ প্রযুক্তি
চীনের ভূমিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দ্বৈত-ব্যবহারের প্রযুক্তি। অর্থাৎ এমন যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি, যা বেসামরিক পণ্যেও ব্যবহার করা যায়, আবার সামরিক ব্যবস্থাতেও কাজে লাগতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পর্যালোচনা কমিশনের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের সঙ্গে চীনের নিরাপত্তা সহযোগিতা সরাসরি প্রচলিত অস্ত্র বিক্রির পরিবর্তে দ্বৈত-ব্যবহারের প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির দিকে সরে গেছে। ইরানি ড্রোনে চীনা সেন্সর, বৈদ্যুতিক রূপান্তরক ও অর্ধপরিবাহী উপাদানসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পাওয়া গেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বরাত দিয়ে বলা হয়, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০টি চালানে দ্বৈত-ব্যবহারের যন্ত্রাংশ পাঠিয়েছে। ইরানের শুল্ক নথি পর্যালোচনা করে ওই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এসব চালানের মধ্যে বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক মোটর, উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের অংশ এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক উপাদান ছিল বলে জানানো হয়েছে।
এ ধরনের সরঞ্জাম সরাসরি সামরিক অস্ত্র হিসেবে বিক্রি না হলেও ড্রোনের দিকনির্দেশনা, যোগাযোগ, নেভিগেশন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ১ হাজার ৩০০টি চালান মানেই ১ হাজার ৩০০টি অস্ত্র বা ড্রোন সরবরাহ এমন নয়; এগুলো ছিল মূলত দ্বৈত-ব্যবহারের বিভিন্ন উপাদানের চালান।
স্যাটেলাইট তথ্য নিয়েও উদ্বেগ
চীনের ভূমিকা শুধু যন্ত্রাংশ সরবরাহে সীমাবদ্ধ কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সেপ্টেম্বরে রয়টার্স জানায়, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জুলাইয়ে জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার আগে ইরান চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে উচ্চ-রেজল্যুশনের স্যাটেলাইট ছবি পেয়েছিল। ওই হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হন। তবে প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম প্রকাশ করা হয়নি এবং চীনা সরকার সরাসরি ওই কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল এমন প্রমাণও প্রকাশ করা হয়নি। রয়টার্সও তথ্যটি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
এ কারণে স্যাটেলাইট তথ্য সরবরাহের বিষয়টি এখনো মূলত অভিযোগ ও গোয়েন্দা-ভিত্তিক প্রতিবেদনের পর্যায়েই রয়েছে। চীন অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তারা আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলে এবং ভিত্তিহীন অভিযোগের বিরোধিতা করে।
অন্যদিকে, ২০২১ সালে চীন ইরানকে তাদের বেইদৌ উপগ্রহ নেভিগেশন ব্যবস্থা ব্যবহারের সুযোগ দেয়। তবে ইরানের সামরিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রে এই ব্যবস্থা কী মাত্রায় ব্যবহৃত হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রকাশ্য তথ্য এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নয়।
রাশিয়ার সহায়তা আরও সরাসরি
ইরানের ড্রোন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে রাশিয়ার ভূমিকা তুলনামূলকভাবে বেশি সামরিক ও প্রযুক্তিগত বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মার্চে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনের বরাতে রয়টার্স জানায়, রাশিয়া ইরানকে স্যাটেলাইট ছবি এবং উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব প্রযুক্তি ইরানের লক্ষ্য নির্ধারণ ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে রয়টার্স ওই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
রাশিয়া শুধু প্রযুক্তি সরবরাহই করছে না, ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতাও ইরানের সঙ্গে ভাগাভাগি করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যে ড্রোনের সংখ্যা, আক্রমণের উচ্চতা এবং কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের ড্রোন ব্যবহার করা হবে—এসব বিষয়ে রুশ অভিজ্ঞতা ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ ইরান রাশিয়াকে শাহেদসহ বিভিন্ন ড্রোন সরবরাহ করে যে অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে, এখন রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও বিপরীত দিকে প্রবাহিত হচ্ছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন কৌশল
আধুনিক যুদ্ধে ড্রোন এখন শুধু নজরদারির যন্ত্র নয়। লক্ষ্য শনাক্তকরণ, হামলা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যস্ত রাখা এবং একই সময়ে বহু ড্রোন ব্যবহারের মতো কৌশলে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়াকে এই প্রযুক্তির বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যবহার সম্পর্কে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দিয়েছে। ফলে রাশিয়ার কাছ থেকে ইরান যে ধরনের সহায়তা পাচ্ছে, তার একটি অংশ সরাসরি কোনো নতুন অস্ত্র দেওয়ার চেয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত কৌশল ও প্রযুক্তির অভিযোজনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এদিকে ইউক্রেনে ব্যবহৃত রুশ শাহেদ-ধরনের ড্রোনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও ক্রমে বদলাচ্ছে। সেপ্টেম্বরে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া এখন জেটচালিত শাহেদ-ধরনের ড্রোন ব্যবহার করছে, যা আগের প্রপেলারচালিত সংস্করণের তুলনায় দ্রুতগতির এবং ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
ফলে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ইরানের নিজস্ব ড্রোন কর্মসূচির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, সেটিও নজরে রাখছেন বিশ্লেষকেরা।
কেন ইরানকে সহযোগিতা করছে চীন ও রাশিয়া?
দুই দেশের উদ্দেশ্য এক নয়। রাশিয়ার জন্য ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত অংশীদার। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আগে থেকেই সহযোগিতা রয়েছে। ফলে ইরানের ড্রোন সক্ষমতা পুনর্গঠনে সহায়তা মস্কোর সামরিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
চীনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। বেইজিং তেহরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখলেও সরাসরি ইরানের পক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পর্যালোচনা কমিশনের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ালেও আনুষ্ঠানিক সামরিক প্রতিশ্রুতি থেকে দূরে রয়েছে।
তবে চীনা বেসরকারি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দ্বৈত-ব্যবহারের প্রযুক্তি ইরানে পৌঁছানোর বিষয়টি ওয়াশিংটনের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কমিশনের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় দ্বৈত-ব্যবহারের প্রযুক্তি সংগ্রহে ভূমিকা রাখছে।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও প্রযুক্তির প্রবাহ
ইরানের ওপর দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তির সরাসরি আমদানি কঠিন। কিন্তু বেসামরিক শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য। এই জায়গাটিই ইরানের ড্রোন কর্মসূচির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নেভিগেশন যন্ত্রাংশ, সেন্সর, মোটর, ব্যাটারি, চিপ ও যোগাযোগ সরঞ্জামের মতো পণ্য বেসামরিক ও সামরিক দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যায়। ফলে এগুলোর বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা সরাসরি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের চেয়ে জটিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও তদন্তেও ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে চীনা ও হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উপাদান সরবরাহের অভিযোগ উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পর্যালোচনা কমিশনের তথ্যে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের ড্রোন কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত দ্বৈত-ব্যবহারের উপাদান চীন ও হংকংভিত্তিক সরবরাহ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরানে পৌঁছেছে।
ড্রোনযুদ্ধের নতুন বাস্তবতা
ইরানের জন্য চীন ও রাশিয়ার এই সহযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল হতে পারে প্রযুক্তিগত স্থিতিস্থাপকতা।
অর্থাৎ কোনো একটি দেশ থেকে সম্পূর্ণ অস্ত্র ব্যবস্থা আমদানি না করেও বিভিন্ন উৎস থেকে যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তি, উপগ্রহ তথ্য ও যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করে নিজস্ব ড্রোন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা।
রাশিয়া যেখানে ইরানকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত ড্রোন প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা দিতে পারে, চীন সেখানে সরবরাহশৃঙ্খল, দ্বৈত-ব্যবহারের ইলেকট্রনিকস এবং নেভিগেশন প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে চীন বা রাশিয়া ইরানের প্রতিটি ড্রোন কর্মসূচিতে সরাসরি জড়িত এমন দাবি করার মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। একইভাবে, চীনা সরকারের প্রত্যক্ষ নির্দেশে সব ধরনের প্রযুক্তি ইরানে যাচ্ছে এমন সিদ্ধান্তও বর্তমান প্রকাশ্য তথ্য থেকে টানা যায় না।
তবু সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, নিষেধাজ্ঞার চাপে থাকা ইরানের ড্রোন শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে আন্তর্জাতিক সরবরাহশৃঙ্খল, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আর এই সহযোগিতা যত গভীর হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ সংঘাতে ড্রোনের ভূমিকা তত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর ও জটিল হয়ে উঠতে পারে।